জুলাই গণঅভ্যুত্থান ২০২৪: ক্যালেন্ডার ছাপিয়ে যেভাবে ৩৬ জুলাই আমাদের হলো

প্রকাশ:

'ছত্রিশ' জুলাই। ইতিহাসের পাতায় কিছু  কিছু শব্দ বা সংখ্যা জনমানসে এমনভাবে গেঁথে যায় যে তা কেবলমাত্র একটি তারিখ থাকে না বরং তা পরিণত হয় একটি জাতীয় প্রতীকে। "৩৬ জুলাই" ঠিক তেমনই এক ঐতিহাসিক অভিব্যক্তি, যা বাংলাদেশের কোটি কোটি মানুষের খুব চেনা, অত্যন্ত পরিচিত ও আবেগঘন একটি শব্দযুগল। স্বাভাবিক নিয়মে ক্যালেন্ডারের পাতায় মাসের দিনসংখ্যা কখনোই ৩১-এর অধিক হওয়ার সুযোগ নেই, কিন্তু বাংলাদেশের মানুষ এই চিরাচরিত নিয়মকে হার মানিয়ে ক্যালেন্ডারের পাতায় একে দিয়েছে নতুন এক সংখ্যা ছত্রিশ জুলাই তথা "৩৬ জুলাই"! আজ বাংলাদেশের কোটি মানুষের মুখে মুখে, সোস্যাল প্লাটফর্মে,পোস্টারে, আলপনায়, দেয়াললিখনে এবং গণমাধ্যমের শিরোনামে "৩৬ জুলাই" একটি গভীর অর্থবহ ঐতিহাসিক দিন হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে।

৩৬ জুলাই বলতে কী বোঝায়?

খুব সহজ ও প্রাঞ্জল ভাষায় ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট তারিখটিকে প্রতিকীভাবে নির্দেশ করতে "৩৬ জুলাই" হিসেবে ব্যবহার করা হয়। চব্বিশ সালের এই দিনেই বাংলাদেশে দীর্ঘ প্রায় দেড় দশক ধরে ক্ষমতার চেয়ারে জেঁকে বসা তৎকালীন সৈরাচার প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা পদত্যাগ করে দেশ ছেড়ে ভারতে পালিয়ে যান, যা বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের গতিপথকে পরিবর্তন করে দেয়।

জুলাই গণ-অভ্যুত্থান ২৪

২০২৪ সালের কোটা সংস্কার আন্দোলন কী এবং কেন শুরু হয়েছিল?

২০২৪ সালের কোটা সংস্কার আন্দোলন ছিল মূলত বাংলাদেশে সরকারি চাকরিতে বিদ্যমান কোটাভিত্তিক নিয়োগ ব্যবস্থার পরিবর্তন ও সংস্কারের দাবিতে গড়ে ওঠা একটি গুরুত্বপূর্ণ ছাত্র আন্দোলন। ২০১৮ সালে হওয়া শিক্ষার্থীদের কোটা সংস্কার আন্দোলনের প্রেক্ষাপটের সরকার একটি পরিপত্র জারি করার মাধ্যমে সরকারি চাকরির ৯ম গ্রেড (পূর্বতন প্রথম শ্রেণি) এবং ১০ম থেকে ১৩তম গ্রেড পর্যন্ত চাকরির নিয়োগে বিদ্যমান সব ধরনের কোটাকে বাতিল ঘোষণা করে। দাবি আদায় হওয়ায় আন্দোলনও তখন থেমে যায়।

কিন্তু নতুন করে ২০২৪ সালের ৫ জুন বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের হাইকোর্ট বিভাগ হঠাৎ ২০১৮ সালের ৪ অক্টোবরের জারি করা সেই সরকারের পরিপত্রকে অবৈধ ঘোষণা করে। ফলে আইন অনুযায়ী সরকারি চাকরিতে পূর্বের কোটাব্যবস্থা পুনর্বহাল হয়ে যায়। এই রায় ঘোষণা হওয়ার পরে শিক্ষার্থী ও চাকরিপ্রত্যাশীদের মধ্যে তীব্র প্রতিক্রিয়ার জন্ম দেয় এবং কোটা ব্যবস্থার যৌক্তিক সংস্কারের দাবিতে আবারো দেশব্যাপী নতুন করে আন্দোলনটি শুরু হয়। ৯ জুন হাইকোর্টের উক্ত রায়কে স্থগিত চেয়ে রাষ্ট্রপক্ষ আবেদন করে। ১০ জুন আন্দোলনকারীরা দাবি মেনে নিতে সরকারকে ৩০ জুন পর্যন্ত সময় ও আল্টিমেটাম বেঁধে দেয় এবং ঈদুল আযহার কারণে আন্দোলনের সাময়িক বিরতি ঘোষণা করে। দাবি আদায় না হওয়ায় ৩০ জুন রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা কোটা পুনর্বহালের প্রতিবাদে রাজপথে মানববন্ধন করে।  ১ জুলাই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরাও বিক্ষোভ করে তিনদিনের কর্মসূচি ঘোষণা করেন। একইদিনে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা ঢাকা-আরিচা মহাসড়ক অবরোধ করে বিক্ষোভ প্রদর্শন করেন এবং চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় মিনারের সামনে অবস্থান নিয়ে আন্দোলন চালিয়ে যান। বড় বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর আন্দোলনকে সংহতি জানিয়ে ২ জুলাই থেকে ৬ জুলাই পর্যন্ত দেশের বিভিন্ন স্থানে স্কুল-কলেজের শিক্ষার্থীরা বিক্ষোভ, মানববন্ধন, মহাসড়ক অবরোধসহ বিভিন্ন ধরনের কর্মসূচি পালন করে।

নামকরণের সূচনা: কীভাবে আগস্ট হয়ে উঠল জুলাই

জুলাই মাসে শুরু হওয়া ছাত্র-জনতার কোটা সংস্কার আন্দোলন যেহেতু আগস্টের প্রথম দিনগুলোতে চলমান ছিল এবং শেষ পর্যন্ত থেমে না গিয়ে বরং আরও তীব্র ও প্রকট রূপ ধারণ করেছিল, তাই রাজপথের ছাত্রজনতা প্রতীকীভাবে জুলাই মাসের হিসাব চালিয়ে যাওয়ার এক অভিনব সিদ্ধান্ত নিয়ে রাজপথেই থেকে যান। তাদের ভাষ্য ছিল দৃঢ় ও স্পষ্ট—যতদিন না যৌক্তিক দাবি পূরণ হচ্ছে, ততদিন জুলাই মাস প্রকৃত অর্থে "শেষ" হবে না। এই বিদ্রোহী মানসিকতা থেকেই ইতিহাসে জন্ম নেয় "৩৬ জুলাই" নামক এক অনন্য কালগণনা পদ্ধতি।

জুলাই মাসের ৩১ তম দিন পার হয়ে ক্যালেন্ডারে যখন আগস্ট মাস শুরু হলো, ঠিক তখনো আন্দোলন থামে নি বরং তা হয়ে উঠেছিল আরও ব্যাপক, সুসংগঠিত ও তীব্র। এই পরিপ্রেক্ষিতে আন্দোলনকারীরা ছাত্র-জনতা এক অভিনব প্রতীকী পদ্ধতির আবিষ্কার করেন, যা ছিল বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক আন্দোলনের ইতিহাসে সম্পূর্ণ নতুন ও বিরল এক ভাষাগত উদ্ভাবন। শিক্ষার্থীরা ঘোষণা দেন, দাবি আদায় না হওয়া পর্যন্ত তারা রাজপথ ছাড়বেন না এবং প্রতীকি অর্থে জুলাই মাসও "শেষ" হবে না। এই যুক্তিতে ১ আগস্টকে তারা অভিহিত করেন "৩২ জুলাই" নামে, ২ আগস্টকে "৩৩ জুলাই", ৩ আগস্টকে "৩৪ জুলাই", এবং ৪ আগস্ট রবিবার—যেদিন সর্বাত্মক অসহযোগ আন্দোলনের কর্মসূচির ডাক আসে—তাকে নির্দেশ করা হয় "৩৫ জুলাই" হিসেবে। সবশেষে আসে কাঙ্খিত ৫ আগস্ট সোমবার। এইদিন ফ্যাসিস্ট প্রধানমন্ত্রীর পদত্যাগ ও দেশ ছেড়ে ভারত পলায়নের খবর প্রকাশ্যে আসে, দিনটিকে গণমানুষ স্বতঃস্ফূর্তভাবে সজ্ঞায়িত করেন "৩৬ জুলাই" বা "দ্বিতীয় স্বাধীনতা" নামে। ভাষাগত দিক থেকে এটিকে বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, এই নামকরণ পদ্ধতিটি ছিল একধরনের সম্মিলিত প্রতিরোধের ভাষার নামান্তর, যেখানে সময়কেও বন্দি করে ফেলা হয়েছিল আন্দোলনের অধীনে।

প্রেক্ষাপট: কোটা সংস্কার আন্দোলন থেকে গণঅভ্যুত্থান

২০২৪ সালের ১ জুলাই থেকে সরকারি চাকরিতে বিদ্যমান কোটা পদ্ধতি সংস্কারের দাবিতে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা রাজপথে নেমে আসেন। প্রাথমিকভাবে এটি ছিল শিক্ষার্থী-কেন্দ্রিক দাবি আদায়ের একটি যৌক্তিক আন্দোলন, যার মূল লক্ষ্যই ছিল সরকারি নিয়োগে কোটা ব্যবস্থার যৌক্তিক ও সময়োপযোগী সংস্কার সাধন করা। এই দাবিকে কেন্দ্র করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ দেশের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী প্রতিবাদ কর্মসূচির মাধ্যমে "বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন" নামে একটি নতুন অরাজনৈতিক সংগঠনের ব্যানারে সংগঠিত হতে থাকে।

শেখ হাসিনার বক্তব্য ও শিক্ষার্থীদের প্রতিক্রিয়া:

শুরুর দিকে আন্দোলন সাধারণ সভা-সমাবেশের মধ্যেই স্থির থাকলেও ১৪ জুলাইয়ে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সাংবাদিকের করা এক প্রশ্নের জবাবে বক্তব্যে কোটা আন্দোলনকারীদের পরোক্ষভাবে “রাজাকারের নাতি-পুতি” হিসেবে অভিহিত করলে ক্ষোভে ফেটে পড়েন সারাদেশের শিক্ষার্থীরা। প্রধানমন্ত্রীর এরকম কাণ্ডজ্ঞানহীন মন্তব্যকে ভালোভাবে নেয় নি তারা। ফলে আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীরা ব্যঙ্গ করে স্লোগান দিতে থাকে:

“তুমি কে? আমি কে?

রাজাকার, রাজাকার!

কে বলেছে? কে বলেছে?

স্বৈরাচার, স্বৈরাচার!

চেয়েছিলাম অধিকার; 

হয়ে গেলাম রাজাকার!” 

মিছিল এসব স্লোগান দেওয়ায় ঠিক পরের দিন ১৫ জুলাই আওয়ামী লীগ ও সরকারের বিভিন্ন নেতা ও মন্ত্রী-আমলারা শিক্ষার্থীদের বিরুদ্ধে ‘মুক্তিযুদ্ধের চেতনা’ নষ্ট করার অভিযোগ আনেন যা শিক্ষার্থীদের আরো ক্ষেপিয়ে তুলে।

শিক্ষার্থীদের উপর পুলিশ ও ছাত্রলীগের হামলা:

বিভিন্ন স্থানে একই দিনে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বিজয় একাত্তর হলে গুলি, হামলা ও লাঠিচার্জ, ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে আহত ছাত্রদের উপর বর্বরোচিত হামলা, রাজশাহী ও কুমিল্লায় সংঘর্ষ শিক্ষার্থীদের উপর ক্ষমতাসীন দল আওয়ামীলীগের সন্ত্রাসী ছাত্র সংগঠন ছাত্রলীগ রড, লাঠি, রামদা, হকিস্টিক ও আগ্নেয়াস্ত্র  ঝাপিয়ে পড়েন। হামলা থেকে রক্ষা পায়নি নারী শিক্ষার্থীও! পুলিশ-প্রশাসনও ছাত্রলীগের পক্ষ নিয়ে নিরপরাধ শিক্ষার্থীদের উপর হামলে পড়ে। শিক্ষার্থীদের দমন করতে পুলিশ রাবার বুলেট,টিয়ারশেল, ছররা গুলি, সাউন্ড গ্রেনেড, কাঁদানে গ্যাস ছুড়ে, দেয় এবং লাঠিপেটা করে আন্দোলনকারীদের ছত্রভঙ্গ করার চেষ্টা করে। দেশব্যাপী পুলিশ ও ছাত্রলীগ-যুবলীগের যৌথ হামলায় সারাদেশে অসংখ্য শিক্ষার্থী আহত হলে ১৬ জুলাই থেকে আন্দোলন তীব্র থেকে তীব্রতর আকার ধারণ করে।এতে আন্দোলনের গতিপথ সম্পূর্ণ বদলে যায়। 

জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের প্রথম শহীদ আবু সাঈদ:

১৬ জুলাই ২০২৪: রাজপথে প্রতিবাদ জানানোর উদ্দেশ্যে দু হাত প্রসারিত করে বুক এগিয়ে দেন রংপুরে বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগের আন্দোলনকারী শিক্ষার্থী আবু সাঈদ, যিনি ছিলেন আন্দোলনের অন্যতম সমন্বয়ক। এসময় ফ্যাসিস্ট হাসিনার পালিত পুলিশের বুলেটের নির্মম আঘাতে মুহুর্তেই ঝাঁঝরা হয়ে যায় আবু সাঈদের দেহ! মুহুর্তেই লুটিয়ে পড়েন রাস্তা তে। তার এই মর্মান্তিক মৃত্যর ভিডিও ফুটেজ মুহুর্তেই সোস্যাল মিডিয়ায় ব্যাপক ভাইরাল হয়ে যায়। এতে সারা বাংলাদেশের নেটিজেনরা তীব্র সমালোচনা ও প্রতিবাদ জানানো শুরু করেন।

শহীদ আবু সাঈদ
একই দিন বিকেল ৪টার সময় ছাত্রলীগের হামলায় চট্টগ্রামের  তিনজন নিহত আন্দোলনকারী নিহত হন,যার মধ্যে একজন ছিলেন চট্টগ্রাম কলেজের শিক্ষার্থী ছাত্রদল নেতা ওয়াসিম ও আরেকজন এমইএস কলেজের শিক্ষার্থী শিবির নেতা ফয়সাল এবং সর্বশেষ নিহত হন ফারুক নামের একজন ফার্নিচারের দোকানের কর্মচারী।  প্রায় একই সময়ে রাজধানীর ঢাকা কলেজের সামনেও যুবলীগ ও ছাত্রলীগের নেতা–কর্মীদের মধ্যকার সংঘর্ষের মধ্যে এক যুবক নিহত হন। আবু সাঈদসহ এসব তাজা প্রাণের মর্মান্তিক মৃত্যু আর কাউকে বসিয়ে থাকতে দেয় নি, এতদিন আন্দোলনে যারা মাঠের বাইরে থেকে সমর্থন দিয়েছিলেন তারাও স্ব শরীরে নেমে যান রাজপথে।

১৭ জুলাই ২০২৪:  দুপুরে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সিন্ডিকেট সভায় জরুরি বৈঠকের মাধ্যমে অনির্দিষ্টকালের জন্য ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাস বন্ধ ঘোষণা করা হয়। সেই সাথে সন্ধ্যা ৬টার মধ্যে সকল শিক্ষার্থীকে আবাসিক হল ত্যাগের করার নির্দেশনা জারি করে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ। এদিন শহীদদের জন্য কফিন মিছিল ও গায়েবানা জানাজার আয়োজন করে শিক্ষার্থীরা।কিন্তু সেখানেও পুলিশ টিয়ার গ্যাস, রাবার বুলেট নিক্ষেপ ও ধরপাকড় চালান।  সেদিনের কফিন মিছিলে সকাল থেকে বিকেল ৩.৩০ পর্যন্ত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ও তার আশেপাশের এলাকায় সংঘর্ষের ঘটনায় আহত হয়ে অন্তত ২১ জন শিক্ষার্থী ঢাকা মেডিকেল কলেজে ভর্তি হয়েছিলেন। এভাবে গোটা আন্দোলনে যুক্ত হয় সম্পূর্ণ নতুন এক মাত্রা সারাদেশে বিক্ষোভের দাবানল ছড়িয়ে পড়ে এবং পুলিশও মিছিলে নির্বিচারে গুলি চালানো অব্যাহত রাখে। এতে কয়েকটি শহরে আরো কয়েকজন শিক্ষার্থী শহীদ হয়ে যান! এইদিন দেশের বিভিন্ন স্থানে ইন্টারনেট সেবায় বিঘ্ন ও ত্রুটি লক্ষ্য করা যায়। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রবেশ করলে সমস্যা এবং অনলাইন যোগাযোগের ক্ষেত্রে ধীরগতি লক্ষ্য করা যায়।

১৮ জুলাই ২০২৪: ইন্টারনেট ব্লকেডের দিন। শিক্ষার্থীদের আন্দোলনকে রোধ করতে সরকার ঢাকাসহ সারাদেশে সকল ধরনের ইন্টারনেট বন্ধ করার সিদ্ধান্ত নেয়। এইদিন মোবাইল ইন্টারনেটকে (4G/5G) সম্পূর্ণ বন্ধ করে দেয় সরকার। ফলে আন্দোলনকারীরা ব্রডব্যান্ড নেটওয়ার্ক (ওয়াইফাই) ব্যবহার করে যোগাযোগ রাখতে শুরু করেন, পরে ব্রডব্যান্ড ইন্টারনেটও কার্যত বন্ধ করে দেয় সৈরাচার হাসিনা। ফলে দেশজুড়ে পূর্ণাঙ্গ ইন্টারনেট ব্ল্যাকআউট সৃষ্টি হয়। এতে করে জনমনে আরও তীব্র ক্ষোভের সৃষ্টি হয়।

১৯ জুলাই ২০২৪: এই দিন এক দিকে চলতে থাকে ইন্টারনেট ব্ল্যাকআউট, অন্যদিকে পুলিশ ও সেনাবাহিনীর কারফিউ! এসময় যাত্রাবাড়ি,  মিরপুর, রামপুরা, বাড্ডাসহ রাজধানীর বিভিন্ন স্থানে তীব্র সংঘর্ষের সূত্রপাত হয় এবং ১৯ জুলাইয়ে সারাদেশে সবচেয়ে বেশি শহীদ হন, সংখ্যার হিসাবে তা ছিল ৬৬+ জন যার মধ্যে শুধুমাত্র রাজধানীতেই নিহত হন অন্তত ৪৪ জন!সেদিন রাজধানীর বিভিন্ন জায়গায় বিক্ষোভ দমন করতে হেলিকপ্টার থেকে কাঁদানে গ্যাস ও সাউন্ড গ্রেনেডও নিক্ষেপ করেছিল হাসিনাবাহিনী!পাশাপাশি হাসপাতালে ছাত্রলীগ কর্তৃক আহতদের উপর হামলা ও পুলিশ কর্তৃক আহতদের গ্রেফতারও চলে সমানতালে!

প্রতিবাদে এই দিনেই (১৯ জুলাই) রাজধানীর শাহবাগ জাতীয় জাদুঘরের সামনে ‘মৃত্যু এত সহজ কেন?: সন্তানের পাশের অভিভাবক’ শীর্ষক শিরোনামে একটি সমাবেশের আয়োজন করেন 'সর্বস্তরের অভিভাবক সমাজ'। অন্যদিকে মানিক মিয়া অ্যাভিনিউয়ে চলে মৌন প্রতিবাদ কর্মসূচি, এটি পালন করেন ছোট পর্দা ও মঞ্চের প্রতিবাদী অভিনয়শিল্পী, আবৃত্তিশিল্পীসহ চলচ্চিত্র জগতের বিভিন্ন সাংস্কৃতিক সংগঠনের নেতা ও কর্মীরা।১৯ জুলাই সরকার পুরো দেশে কারফিউ জারি করে যা কার্যকর হয় মধ্যরাত থেকে, একই সঙ্গে মাঠপর্যায়ে বেসামরিক প্রশাসনকে সহায়তার জন্য মোতায়েন করা হয় সেনাবাহিনীকে। কারফিউ জারির পর থেকেই র‍্যাব ও সেনাবাহিনী যৌথভাবে পরিচালনা করে ‘ব্লক রেইড’ নামে গণগ্রেপ্তার অভিযান! এইদিন 'ব্লক রেইডের' আওতায় গ্রেফতার হন সমন্বয়ক নাহিদ ইসলাম, আসিফ মাহমুদ সজীব ভুঁইয়াআবু বাকের মজুমদার।  সন্ধ্যার পরে ধানমন্ডি থেকে আবু বাকের কে, রাত ১১টার দিকে হাতিরঝিলের আবাসিক এলাকা থেকে আসিফকে ও মধ্যরাতের দিকে খিলগাঁওয়ের নন্দীপাড়া এলাকা থেকে নাহিদকে তুলে নিয়ে যায় সাদা পোশাকধারী পুলিশ।

৯ দফা তৈরি ও ঘোষণা:

প্রধান সমন্বয়কদের অনুপস্থিতে আন্দোলন স্তিমিত হয়ে যাওয়ার আশংকা তৈরি হয়। ঠিক সেই সময়ে এই আশংকা থেকে অন্যান্য স্টেকহোল্ডারের সাথে সমন্বয় সাধন করে গণহত্যার বিচার, প্রধানমন্ত্রীর পদত্যাগের দাবিসহ ৯ দফা দাবি সম্বলিত একটি ড্রাফট তৈরি করেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের তৎকালীন শিবিরের সেক্রেটারি এসএম ফরহাদ এবং তাদের আশ্রয়ে থাকা বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের অন্যতম সমন্বয়ক আব্দুল কাদেরকে দিয়ে তা পাঠ করানো হয় রাত সাড়ে নয়টার দিকে। ০৯ দফার সেই ভিডিও বার্তা মুহুর্তেই বিভিন্ন পত্রিকা হাউজ, সাংবাদিক ও আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে পৌঁছিয়ে দেন বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্রশিবিরের একটি টিম যার নেতৃত্বে ছিলেন শিবির নেতা সিবগাতুল্লাহ সিবগা ও আবু সাদিক কায়েমসহ আরও কয়েকজন কেন্দ্রীয় নেতা। নয় দফা ঘোষণার মাধ্যমে সমন্বয়ক আব্দুল কাদের দ্বিতীয়বারের মতো ‘কমপ্লিট শাটডাউন’ কর্মসূচি ঘোষণা করেন। 

৯ দফা দাবিগুলো কি কি?

ঐতিহাসিক নয় দফার দাবিগুলো ছিল নিম্নরূপ:

১. প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা কে ছাত্র হত্যা করার দায় স্বীকার করে জাতির কাছে প্রকাশ্যে ক্ষমা চাইতে হবে।
২. ছাত্র হত্যার দায় নিয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল এবং সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের কে মন্ত্রিপরিষদ ও দল থেকে স্থায়ীভাবে পদত্যাগ করতে হবে।
৩. ঢাকাসহ দেশের যত জায়গায় ছাত্র শহীদ হয়েছেন, সেখানকার দায়িত্বে থাকা ডিআইজি, পুলিশ কমিশনার ও পুলিশ সুপারদের অবিলম্বে চাকরি থেকে বরখাস্ত করতে হবে।
৪. ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় ও রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য ও প্রক্টররদে কে পদত্যাগ করতে হবে।
৫. যে পুলিশ সদস্যরা আন্দোলনকারীদের কে গুলি করেছেন, ছাত্রলীগ, যুবলীগসহ যেসব সন্ত্রাসী শিক্ষার্থীদের ওপর বর্বরোচিত হামলা চালিয়েছেন এবং নির্দেশ দিয়েছেন, তাদেরকে আটক করে হত্যা মামলা দায়ের করে দ্রুত সময়ের মধ্যে আদালতে গ্রেপ্তার দেখাতে হবে।
৬. দেশব্যাপী আন্দোলন করতে গিয়ে যেসব শিক্ষার্থী ও নাগরিক শহীদ ও আহত হয়েছেন, তাঁদের পরিবারকে ক্ষতিপূরণ প্রদান করতে হবে।
৭. ঢাবি, জাবি, চবি, রাবিসহ সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ছাত্রলীগ নামক সন্ত্রাসী সংগঠনকে নিষিদ্ধের পাশাপাশি দলীয় লেজুড়বৃত্তিক ছাত্ররাজনীতি নিষিদ্ধ করে ছাত্র সংসদকে পুনরায় কার্যকর করতে হবে।
৮. অবিলম্বে দেশের সকল শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও হলসমূহকে খুলে দিতে হবে।
৯. যেসব ছাত্র কোটা সংস্কার আন্দোলনে অংশগ্রহণ করেছেন, সক্রিয় ভূমিকা রেখেছেন তাদের কোনো ধরনের একাডেমিক ও প্রশাসনিক হয়রানি করা হবে না মর্মে নিশ্চয়তা দিতে হবে।

২০-২১ জুলাই: ৯ দফা ঘোষণার পরে ধাওয়া-পাল্টা,সংঘর্ষ আরও প্রকট আকার ধারণ করে। এই সময়ে আপিল বিভাগ শিক্ষার্থীদের দাবিকে মেনে নিয়ে কোটাকে ৫% এ নামিয়ে এনে রায় দিলেও শিক্ষার্থীরা আর তা মেনে নেননি। কারণ ততক্ষণে অসংখ্য তাজা প্রাণ ঝড়ে গেছে। তাই রক্তের বদলা নেওয়া হয়ে উঠেছিল অনিবার্য। তাই আন্দোলন ৯ দফা দাবিতেই আন্দোলন চলমান রাখেন।

২৩ জুলাই, ২০২৪: কোটা সংস্কারের দাবিতে আন্দোলনরত শিক্ষার্থীরা জরুরি চার দফা দাবি জানিয়ে সরকারকে তা বাস্তবায়ের জন্য ৪৮ ঘন্টা সময় বেঁধে দেয়। দাবিগুলো হলো : 

☑ইন্টারনেট সেবা পুনরায় চালু করতে হবে।
☑অবিলম্বে কারফিউ প্রত্যাহার করতে হবে
☑শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলো থেকে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীদের সরিয়ে নিয়ে সুষ্ঠু পরিবেশ সৃষ্টি করে আবাসিক হল খুলে দিতে হবে।
☑সারা দেশে কোটা সংস্কার আন্দোলনের সমন্বয়কদের জীবনের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে।

২৪ জুলাই, ২০২৪: আন্দললনের অন্যতম দুই সমন্বয়ক আসিফ মাহমুদ ও আবু বাকের মজুমদার কে চোখ বেঁধে ফেলে যায় আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। এইদিন কয়েক দিনের সম্পূর্ণ ইন্টারনেট ব্ল্যাকআউটের পরে সীমিত আকারে ব্রডব্যান্ড ইন্টারনেট পুনরায় চালু  হয়। 

২৫ জুলাই, ২০২৪:

এই দিন বৈষম্য বিরোধী ছাত্র আন্দোলনের পক্ষ থেকে আন্দোলনরত সকল শিক্ষার্থীর জন্য আটটি বার্তা দেওয়া হয়। যেমন:

☑☑সারাদেশে হতাহতদের তালিকা তৈরি,
☑☑ছাত্রদের হত্যা ও হামলায় জড়িতদের নাম ও পরিচয় চিহ্নিত করা
☑☑বিশ্ববিদ্যালয়গুলো তে  হল খুলে দেওয়ার জন্য চাপ তৈরি করা।
☑☑শিক্ষার্থীদের উদ্দেশ্যে এসব বার্তা সংবলিত একটি বিবৃতি ফেসবুকে শেয়ার করেন সমন্বয় আসিফ মাহমুদ, আবু বাকের মজুমদার ও সহ-সমন্বয়ক রিফাত রশিদ।

সমন্বয়কদের আটক, আন্দোলন স্থগিতের ঘোষণা এবং শিক্ষার্থীদের প্রতিক্রিয়া:

২৬ জুলাই ২০২৪: এই দিন রাজধানীর গণস্বাস্থ্য নগর হাসপাতাল থেকে আন্দোলনের অন্যতম তিনজন সমন্বয়ক—নাহিদ ইসলাম, আসিফ মাহমুদ ও আবু বকর মজুমদারকে সাদাপোশাকধারী ব্যক্তিরা তুলে নিয়ে যায় এবং পরে তাদেরকে গোয়েন্দা পুলিশের (ডিবি) হেফাজতে রাখা হয়।

২৭ জুলাই ২০২৪: ২৭ তারিখে আন্দোলনের আরও দুইজন সমন্বয়ক—সারজিস আলম ও হাসনাত আব্দুল্লাহকে আটক করে ডিবি। ২৮ জুলাই ভোরের সময় আরেক সমন্বয়ক নুসরাত তাবাসসুমকও আটক করে ডিবি। এভাবে ২৬ থেকে ২৮ জুলাইয়ের মধ্যে মোট ছয়জন সমন্বয়ককে ডিবির হাতে আটক হতে হয়।

২৮ জুলাই ২০২৪: এই দিন ঠিক রাত ১০টার দিকে, ডিবি হেফাজতে থাকা এই ছয়জন সমন্বয়ক হঠাৎ একটি ভিডিও বার্তার মাধ্যমে আন্দোলনের কর্মসূচি প্রত্যাহারের ঘোষণা দেন। কিন্তু ঘোষণাটি তাৎক্ষণিকভাবে ব্যাপক বিতর্ক ও সন্দেহের জন্ম দেয়। সারাদেশে বাইরে থাকে আন্দোলনের অন্যান্য সমন্বয়ক ও শিক্ষার্থীরা এই ঘোষণা কে প্রত্যাহার করেন। এই প্রেক্ষাপটে আন্দোলনের বাকি সমন্বয়ক, ছাত্রসংগঠনের নেতৃবৃন্দ ও অংশগ্রহণকারী শিক্ষার্থীরা নতুন নতুন কমিটি প্রকাশ করেন এবং পূর্বঘোষিত কর্মসূচি চালিয়ে যাওয়ার ঘোষণা দেন এবং সেদিন মোবাইল ইন্টারনেট কে ধাপে ধাপে পুনরায় চালু করা হয়।শুরুতে সীমিত গতিসহ কিছু বিধিনিষেধ থাকলেও, পরে ধীরে ধীরে তা স্বাভাবিক সংযোগ ফিরে আসে।

২৯ জুলাই, ২০২৪:

বন্দি সমন্বয়কদের বার্তার মাধ্যমে কোটা সংস্কার আন্দোলনের সব কর্মসূচি প্রত্যাহার করার ঘোষণার পরেও রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন জেলা ও বিশ্ববিদ্যালয় কলেজগুলোতে বিক্ষোভ অব্যাহত রাখেন আন্দোলনকারীরা। এসব মিছিল থেকে বেশ কয়েকজনকে আটক করে পুলিশ। এই সময় শিক্ষার্থীদের মিথ্যা ও হয়রানিমূলক গ্ৰেফতার বন্ধ ও আটককৃতদের দ্রুত মুক্তির দাবিতে ‘নিপীড়ন বিরোধী শিক্ষক সমাবেশ' সমাবেশ করেন বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক নেটওয়ার্ক নামে একটি সংগঠন।

৩০ জুলাই, ২০২৪:

চলমান আন্দোলনে পুলিশ নির্বিচারে গুলি চালিয়ে দুই শতাধিক মানুষের তাজা প্রাণ কেড়ে নিয়ে উক্ত ঘটনায় সরকারিভাবে শোক পালন করে।কিন্তু আন্দোলনকারীরা এই রাষ্ট্রীয় শোককে ভালোভাবে নেয় নি,তারা সরকারের মায়াকান্না সূচক শোককে প্রত্যাখ্যান করে একটি প্রতীকী প্রতিবাদ জানান এবং সকলে চোখ-মুখে লাল কাপড় বেঁধে ছবি তুলে ফেসবুক, টুইটারে পোস্ট করে নিজেদের অবস্থান জানান দেন। এদিকে আন্দোলন চলাকালীন সময়ে গ্রেপ্তার হওয়া মোট ১৭ শিক্ষার্থীকে থানা থেকে মুক্ত করে আনতে সহায়তা করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টরিয়াল টিম।  অন্যদিকে, চলমান আন্দোলনে সাধারণ শিক্ষার্থীদের ওপর বর্বরোচিত হামলার ঘটনায় তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ জানিয়ে এবং শিক্ষার্থীদের জানমালের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে অবিলম্বে ব্যর্থতার অভিযোগ তুলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের পদত্যাগ দাবি করেন বিএনপি-জামায়াতপন্থী শিক্ষকদের সংগঠন 'সাদা দল'।

৩১ জুলাই, ২০২৪:

৯ দফা দাবির পক্ষে সারাদেশে প্রতিটা জেলায় ‘মার্চ ফর জাস্টিস’ কর্মসূচি পালন করে শিক্ষক ও  ছাত্র-জনতা। দেশের বিভিন্ন আদালত, বিশ্ববিদ্যালয় কলেজের ক্যাম্পাস এবং রাজপথে এই কর্মসূচি দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে। ঢাকায় এই কর্মসূচির অংশ হিসেবে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ও বুয়েটের শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা সম্মিলিতভাবে হাইকোর্ট অভিমুখে মিছিল  নিয়ে এগিয়ে যেতে থাকলে পথরোধ করে বসেন পুলিশ এবং সেই সময় কয়েকজনকে আটকও করেন। আটককৃত শিক্ষার্থীদের ছাড়াতে এগিয়ে যান ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের লোক প্রশাসন বিভাগের শিক্ষিকা ড. শেহরীন আমীন ভূঁইয়া। এসময় তার উপরে এক পুলিশ সদস্য শারীরিকভাবে আঘাত করে—তার হাত মুচড়ে দেয়! একই দিনে রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে পুলিশি বাধা, বিক্ষোভ ও আটক অভিযান চালায় পুলিশ।

১ আগস্ট, ২০২৪:

এই দিনে অনশনেরত অবস্থায় আটক হওয়া ছয় সমন্বয়ককে ডিবি  মুক্তি দেয়। মুক্তির পরেই তারা অভিযোগ তুলেন যে, সেখানে তাদেরকে বিভিন্নভাবে শারীরিক ও মানসিক নির্যাতনের মুখে জিম্মি করে ২৮ জুলাই আন্দোলন প্রত্যাহারের ঘোষণা দিতে বাধ্য করেন।সেদিন কোটা সংস্কার আন্দোলনে অংশ নিয়ে সারা দেশে যারা নিহত হয়েছেন, তাদের স্মরণে শিক্ষার্থীরা ‘রিমেম্বারিং আওয়ার হিরোস’ শিরোনামে এলটি কর্মসূচি পালন করেন। এতে সংহতি জানিয়ে সারাদেশে শিক্ষকরা বিভিন্ন জায়গায় মানববন্ধন, মৌন মিছিল ও প্রতিবাদ সমাবেশ জারি রাখেন। এই ঘটনায় জাতিসংঘের তত্ত্বাবধানে সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ তদন্ত ও বিচারের দাবি জানান শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা।

২ আগস্ট, ২০২৪:

এই দিনে গণগ্রেফতার বন্ধ, হত্যা ও নিপীড়নের তদন্ত ও বিচার, আটককৃত শিক্ষার্থীদের মুক্তি নিশ্চিত, কারফিউ প্রত্যাহার এবং শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানকে পুনরায় চালুর দাবিতে ‘দ্রোহযাত্রা’ নামক কর্মসূচি অনুষ্ঠিত হয়েছিল। জাতীয় প্রেসক্লাবের সামনে থেকে এটি শুরু হয়।উক্ত কর্মসূচিতে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক-শিক্ষার্থীসহ মানবাধিকারকর্মী, বিভিন্ন সাংস্কৃতিক সংগঠক ও শ্রমজীবী মানুষেরা স্বতস্ফুর্তভাবে অংশগ্রহণ করেন।

৩ আগস্ট, ২০২৪:

এই দিন সকল ছাত্রসংগঠন ও শিক্ষার্থী, সমন্বয়কদের সাথে আলোচনা করে শহীদ মিনারে আয়োজিত ছাত্র ও নাগরিক সমাবেশ থেকে সরকার পতনের ১ দফা ঘোষণা করে ‘বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন’-এর সমন্বয়ক নাহিদ ইসলাম এবং ক্যাম্পাসগুলো খুলে দেওয়ার আল্টিমেটাম ঘোষণা করেন।

৪ আগস্ট ২০২৪:

এই দিনে আন্দোলনের অন্যতম সমন্বয়ক আসিফ মাহমুদ ঘোষণা করেন শিবির নেতা আবু সাদিক কায়েমের তৈরি ১ দফা ও অসহযোগ আন্দোলনের দাবিতে লেখা একটি খসড়া। যা মূলত অন্যান্য স্টেইকহোল্ডার, সমন্বয়কদের সাথে আলোচনা করেই তৈরি করেছিল সাদিক কায়েম। লেখাটি পড়ে আসিফ মাহমুদ সর্বাত্মক অসহযোগ আন্দোলনের ডাক দেন। ঘোষিত কর্মসূচি অনুযায়ী ৪ আগস্ট দেশজুড়ে সর্বাত্মক অসহযোগ আন্দোলনের প্রথম দিন হিসাবে পালিত হয়। দেশের বিভিন্ন স্থানে বিক্ষোভ মিছিল ও কর্মসূচি অনুষ্ঠিত হয়।

যোগ দেয় কৃষক, শ্রমিক, কামার, কুমার, তাঁতি, জেলে, ছাত্র, অছাত্র, রাজনৈতিক ও অরাজনৈতিক শত শত সংগঠন। এভাবে কোটা সংস্কারের মূল দাবিকে ছাপিয়ে রাজপথ থেকে ততক্ষণে উঠে আসে সরকার পতনের নতুন নকশা। আন্দোলন রূপ নেয় গণঅভ্যুত্থানে এদিকে পরিস্থিতি ভয়ানক হয়ে উঠলে ভয়ে পেয়ে যান শেখ হাসিনা এবং আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের সঙ্গে আলোচনায় জন্য গোলটেবিল বৈঠকে বসার আগ্রহ প্রকাশ করেন আওয়ামী লীগ নেতারা। তবে আন্দোলনকারীরা সরকারের এই প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করে পরিষ্কার ভাষায় জানিয়ে দেন—সরকারের সঙ্গে সংলাপের পথ আর খোলা নাই। 

৪ আগস্ট দেশজুড়ে দেশব্যাপী ব্যাপক সংঘর্ষ ও তীব্র উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে, যা পরিস্থিতিকে আরও সংকটাপন্ন করে তোলে এবং আন্দোলনকে বেগবান করে। এতে পরিস্থিতি সৈরাচার সরকারের নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়। পরিস্থিতি সামাল দিতে না পেরে অফিস,আদালত বন্ধের ঘোষণা দিয়ে ৪ জুলাই সন্ধ্যাবেলা থেকে অনির্দিষ্টকালের জন্য কারফিউ জারি করে সরকার। অন্যদিকে মুক্তিকামী 'বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন' এই অযৌক্তিক কারফিউকে প্রত্যাখ্যান করে ছাত্র-জনতার ওপর নির্বিচারে হামলা, গুলি ও হত্যার প্রতিবাদে ‘লং মার্চ টু ঢাকা’ কর্মসূচি ঘোষণা দেন। প্রথমে ৬ আগষ্ট তারিখে 'লং মার্চ টু ঢাকা' কর্মসূচি ডাকা হলেও পরবর্তীতে পরিস্থিতি বিবেচনায় একদিন এগিয়ে নিয়ে ৫ আগস্ট তারিখকে চূড়ান্ত করা হয়। লং মার্চ কে সফল করতে সারা দেশের আপামর ছাত্রজনতাকে ঢাকায় আসার আহ্বান জানানো হলে স্বতঃস্ফূর্ত সাড়া পাওয়া যায়। ইতিহাসের অংশ হতে রাতারাতি ঢাকায় পাড়ি জমাতে থাকে আশেপাশে শহর ও জেলার মানুষজন। দাবি সবার ১ দফা।

ভোর হতে হতেই পুরো রাজপথ দখলে নেয় ছাত্র-জনতা।সময় যত গড়ায় রাজধানী ঢাকার বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্টগুলো তে শক্ত অবস্থান নেয় আন্দোলনকারী শিক্ষার্থী-জনতা। কার্যত শিক্ষার্থীদের দখলে চলে যায় রাজধানী ঢাকার বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ এলাকা।একই সাথে আওয়ামীলীগ,যুবলীগ ও ছাত্রলীগের সন্ত্রাসীরাও বিভিন্ন জায়গায় অবস্থান নেয় আন্দোলন দমনের উদ্দেশ্যে। এতে করে থেমে থেমে সংঘর্ষ বাঁধে কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার, শাহবাগ, বাংলামোটর, কাওরানবাজার, উত্তরা, মিরপুর ১০, ইসিবি চত্বর, রামপুরা, বাড্ডা, পল্টন, প্রেসক্লাব, যাত্রবাড়ি-কাজলা, সাইন্সল্যাব, যমুনা ফিউচার পার্ক, কুড়িলসহ বিভিন্ন পয়েন্টে। কিন্তু আরেকটু সকাল হতে না হতেই পরিস্থিতি সম্পূর্ণ পরিবর্তন হয়ে যায়। পুরো রাজধানী আন্দোলনকারীদের হাতের মুঠোয় চলে আছে। মহাখালি ডিওএইচএস এ অবসরপ্রাপ্ত সেনাকর্মকর্তা ও তাদের পরিবার ছাত্রদের বিক্ষোভে অংশগ্রহণ করেন। পুলিশ ও সেনা কর্মকর্তার বুলেট চালানোর শক্তি না পেয়ে থেমে যান। কারফিউ কার্যত ভেঙে যায়। বিক্ষুব্ধ জনতা স্লোগানে স্লোগানে বঙ্গভবন অভিমুখে যেতে থাকে।

৫ আগস্ট ২০২৪: শেখ হাসিনা সরকারের পতনের দিন

২০২৪ সালের ৫ আগস্ট ( ৩৬ জুলাই) বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে এক যুগান্তকারী দিন। দীর্ঘদিনের ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানের ফলে সেদিন সৈরাচার হাসিনার পতন হয়।সেদিন সকাল থেকেই রাজধানী ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ এলাকা,পয়েন্টে লক্ষ লক্ষ মানুষ রাজপথে নেমে আসেন। বিক্ষুব্ধ ছাত্রজনতা দেশের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা ও সড়কে অবস্থান নেন এবং মিছিলি মিছিলে গণভবনের দিকে অগ্রসর হতে থাকেন।পরিস্থিতি দ্রুত পরিবর্তিত হতে থাকলে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী কারফিউ বাস্তবায়ন না করে পিছু হটতে বাধ্য হয়। পরিস্থিতি ভয়াবহ দেখে শেখ হাসিনা পদত্যাগ করেন এবং নিজের জান বাঁচাতে দেশ ছেড়ে ভারতে পালিয়ে যান। এরপর আন্দোলনকারীরা যথারীতি গণভবনে প্রবেশ করেন এবং সেখানে বিশাল জনসমাগম ঘটে।

৫ আগস্ট দুপুরে দেশজুড়ে ব্যাপক জল্পনা-কল্পনার মধ্যে সেনাপ্রধানের ঘোষণায় নিশ্চিত হয় প্রধানমন্ত্রীর পদত্যাগ ও দেশত্যাগের খবর। সঙ্গে সঙ্গে সারাদেশের ছাত্র-জনতা আনন্দ-উচ্ছ্বাসে ফেটে পড়েন। বিকেল বেলা সেনাবাহিনীর পক্ষ থেকে জাতির উদ্দেশে একটি বার্তা দেওয়া হয়।এতে দেশবাসীর প্রতি শান্তি-শৃঙ্খলা বজায় রাখার আহ্বান জানান সেনাবাহিনী। একই সাথে উক্ত বক্তব্যে একটি অন্তর্বর্তীকালীন সরকার ব্যবস্থা গঠনেরও উদ্যোগ নেওয়ার কথা জানানো হয়। এভাবেই একটি কোটা সংস্কারকেন্দ্রিক ছাত্র আন্দোলন ধাপে ধাপে রূপান্তরিত হয় ঐতিহাসিক গণঅভ্যুত্থানে, যা পরবর্তীতে ইতিহাসে স্থায়ীভাবে পরিচিতি পায় "জুলাই বিপ্লব" বা "জুলাই গণঅভ্যুত্থান" নামে।

বাংলাদেশের রাজনৈতিক পটভূমিতে ও ক্ষমতার কাঠামোতে একটি বড় ধরনের পরিবর্তন নিয়ে আসে চব্বিশের ছাত্র জনতার জুলাই গণ-অভ্যুত্থান। এই ঘটনাকে ছাত্রজনতা "জুলাই-আগস্ট গণঅভ্যুত্থানের চূড়ান্ত পরিণতি" হিসেবে উল্লেখ করেন এবং দিনটিকে বাংলাদেশের আন্দোলন-সংগ্রাম ও ইতিহাসের একটি গুরুত্বপূর্ণ মোড় হিসেবে চিহ্নিত করা হয়। পরবর্তীতে জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের প্রভাব রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক পরিবর্তনের ভিত্তি তৈরি করে দেয়।

Post a Comment

Previous Post Next Post