মক্কা,মদীনা এবং আল আকসা মুসলমানদের প্রধান তিনটি পবিত্র স্থান।প্রাধান্যতার দিক দিয়ে ইসলামে বায়তুল মুকাদ্দাসের অবস্থান তৃতীয়। আমাদের আজকের রকমারি তে থাকছে পবিত্র আল আকসার গুরুত্ব ও ইতিহাস।
পবিত্র আল আকসা যা সবার কাছে বায়তুল মোকাদ্দাস নামে পরিচিত।পবিত্র আল আকসা ফিলিস্তিনের রাজধানী জেরুজালেমে অবস্থিত।এটিই ছিল মুসলমানদের প্রথম ক্বিবলা। ইসলামের প্রাথমিক যুগে রাসূল (সা) এবং তার সাহাবিরা এই বায়তুল মোকাদ্দাসের দিকে মুখ করে নামাজ সহ অন্যান্য ধর্মীয় ইবাদত বন্দেগী করতেন। পরবর্তী তে প্রিয় নবি হযরত মুহাম্মদ (সা) এর চাওয়া ও মনো বাসনাকে পূরণ করার নিমিত্তে এবং বিভিন্ন প্রজ্ঞার কারণে মহান আল্লাহ তায়ালার নির্দেশে কিবলা কে পরিবর্তন করা হয়।বায়তুল মোকাদ্দাস কে কিবলা থেকে পরিবর্তন করা হলেও এটি প্রতিটি মুসলমানের হৃদয় জুড়ে আছে।
পবিত্র আল আকসার নির্মান কাজ সম্পর্কে অনেক তথ্য উপাত্ত রয়েছে কারণ এ মসজিদের নির্মান ও সংস্কার কাজ কখনো থেমে থাকে নি বরং বিভিন্ন সময়ে মসজিদটির সংস্কার ও পুনঃনির্মান কাজ সম্পাদিত হয়েছে।বিশ্বস্ত মত অনুসারে, সর্ব প্রথম মসজিদটির ভিত্তি স্থর স্থাপন করেন তারপর মসজিদটির অসমাপ্ত কাজ সম্পূর্ণ করার জন্য কাজ করেছেন নবি হযরত দাঊদ (আঃ) এবং তাঁর মৃত্যুর পরে খৃষ্টপূর্ব ১০০৪ সালে নবি হযরত সুলায়মান (আঃ) মসজিদটি পুনর্নির্মাণ করেন।হযরত সুলায়মান (আঃ) এর মো'জেযা ছিল পশু পাখিদের সাথে কথা বলার ক্ষমতা এবং জিন জাতি ছিল তার অনুগত। হযরত দাঊদ (আঃ) মারা যাওয়ার পর মসজিদ আল আকসার কাজ কিছু সময়ের জন্য স্থগিত থাকে।
পরবর্তীতে মসজিদটির অস্থায়ী কাজ সম্পন্ন করার দায়িত্ব নেন তার পূত্র নবি হযরত সোলায়মান (আঃ)। হযরত সোলায়মান (আঃ) তাঁর মো'জেযার ক্ষমতাবলে জিনদের কে মসজিদ টি পুণঃনির্মানের দায়িত্ব দেন এবং জিন জাতি তার অবুগত থাকায় দল বেঁধে নির্মান কাজ করে। এ সময় জিন জাতি সমূ্দ্র থেকে সুন্দর চাকচিক্য মণি মুক্তা সংগ্রহ করে মসজিদ টি তে স্থাপন করেন। পাশে লাঠিতে ভর করে জিনদের কার্যক্রম পরিদর্শন করেছিলেন নবি হযরত সোলায়মান (আঃ)।
উল্লেখ আছে জ্বিনদের দ্বার মসজিদটির কার্যক্রম চলাকালীন লাঠিতে বড় করে দাঁড়িয়ে থাকা অবস্থায় তিনি মৃত্য বরণ করেন এবং আল্লাহ তায়ালা প্রিয় ঘরের কাজ সম্পন্ন করার জন্যই জ্বিনদের কে বুঝতে দেন নি যে নবি আঃ মারা গেছে।মৃতবস্থায় ও হযরত সোলায়মান (আঃ) লাঠিতে ভর করে দাঁড়িয়ে থাকায় জ্বিনরা বুঝতে পারে নি এবং তাঁর ভয়ে কাজ চালিয়ে গেছে।এভাবেই গড়ে উঠেছে বায়তুল মোকাদ্দাস।
হযরত সোলায়মান (আঃ) এর পরে আরো অনেক নবি রাসূল এবং মুসলিম শাষক এতে হাত দেন।বিভিন্ন সময়ই এর সংস্কার করা হয়।খলিফা উমর ইবনুল খাত্তাবের আমলে মুসলমানরা পুরো জেরুজালেম দখল করে।জেরুজালেম বিজয় করার পরে খলিফা হযরত ওমর (রাঃ) হলে মসজিদটির পাশে আরেকটি ছোট মসজিদ নির্মান করেন যা কুব্বাতুস সাকরা নামে পরিচিত।হযরত ওমর ফারুক (রাঃ) এর পরে উমাইয়া খলিফা আবদুল মালিকের শাষণামলেও মসজিদটির পুনর্নির্মাণ কাজ ও সংস্কার করা হয়।৭৮৬ সালে জেরুজালেমে শক্তিশালী ভূমিকম্পের ফলে মসজিদটি ক্ষতিগ্রস্ত হলে এর পুনর্নিমানের দায়িত্ব নেন আব্বাসীয় সপ্তম খলিফা আল মনসুর।এর পরে আবারো কিছুটা পূনর্নির্মাণ করেন খলিফা আল মাহদী। ১০৩৩ আবারো একটি ভূমিকম্পে মসজিদ টি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল। ফাতিমি খলিফা আলি আজ-জাহির ক্ষতিগ্রস্ত মসজিদটির পুনঃসংস্কার করেন।
১০৯৯ খ্রিষ্টাব্দে ক্রসেডাররা জেরুজালেম দখল করে এবং আল আকসা মসজিদ সহ কুব্বাতুস সাকরা কে তারা নিজেদের গীর্জা হিসেবে ব্যবহার করে। বহু বছর অতিক্রম হলে মহা বীর সালাহ উদ্দিন আইয়্যুবি ক্ষমতায় এলে জেরুজালেম আবারে উদ্ধার করে আল আকসাকে মসজিদ হিসেবে চালু করেন।
মহান আল্লাহ তায়ালার ইবাদত করার জন্য মক্কা,মদিনা এবং আকসা তে যাওয়া বৈধ এবং রাসূল (সা) এর হাদীসে এসেছে এই তিনটি পবিত্র স্থানে ইবাদত করলে অন্যান্য জায়গার তুলনায় অনেক বেশি সাওয়াব পাওয়া যায়।ধর্মীয় কারণে রাসূল স. যে তিনটি স্থান সফরের কথা বলা হয়েছে তার মধ্যে বায়তুল মোকাদ্দাসের কথা এসেছে তৃতীয় স্থানে।বায়তুল মুকাদ্দাসের ইতিহাসের সাথে জড়িয়ে আছে রাসূল (সা) এর মে'রাজের ঘটনা।
এ বিষয়ে হযরত আনাস (রা) থেকে বর্ণিত একটি হাদীস নিম্নরূপ:হযরত মুহাম্মদ (সা.) বলেছেন,- ‘বোরাক নিয়ে আসা হলো। বোরাক হচ্ছে এমন এক জন্তু বিশেষ, যা দেখতে ধব ধবে সাদা এবং আকারে দীর্ঘ। বোরাক গঠনে গাঁধার চেয়ে বড় এবং খচ্চরের চেয়ে ছোট এবং এটিটি এক কদম রাখে দৃষ্টির শেষ সীমানায়’। বিশ্ব নবি আরো বলেন, ‘আমি বোরাকের উপর আরোহন করে বায়তুল মোকাদ্দাস পর্যন্ত গমন করলাম,তারপর আমি সেটাকে নবিদের জন্তুর খুটির সাথে বেঁধে রাখলাম।অতঃপর আমি মসজিদুল আকসাতে প্রবেশ করে ০২ রাকাত নামাজ আদায় করলাম। পরিশেষে সেখান হতে আমাকে উর্ধ্বাকাশে নিয়ে
যাওয়া হয়।হাদীসটি সহীহ মুসলিম শরিফের।
পবিত্র কুরআনেও মসজিদ আল আকসার উল্লেখ আছে।আল্লাহ তায়ালা ইরশাদ করেন, ‘সব মহিমা তাঁর যিনি তাঁর বান্দাকে এক রাতে মসজিদ আল হারাম থেকে মসজিদুল আকসা পর্যন্ত ভ্রমণ করিয়েছিলেন এবং যার চতুর্পার্শ্বকে আমি বরকতময় করেছি। যাতে করে আমি আমার নিদর্শন তাঁকে প্রদর্শন করি।’ (সুরা বনী ইসরাইল : আয়াত ১)
উপরোক্ত হাদীস এবং কুরআনের আয়াতে মাসজিদুল আকসা বলতে মূলত পবিত্র বায়তুল মোকাদ্দাস কে বোঝানো হয়েছে। মেরাজের রজনীতে হযরত মুহাম্মদ (সা) মাসজিদুল হারাম থেকে রাতের প্রথম অংশে আল আকসাতে এসে পৌঁছান যাকে ইসলামী পরিভাষায় বলা হয় ইসরা।প্রিয় নবি (স) আকসাতে অবতরণ করে এখানে অন্যান্য নবি রাসূলদের কে নিয়ে দুই রাকাত নফল ইবাদত করেন এবং সেই নামাজের ইমামতি করে হযরত মুহাম্মদ (সা)।
সব মিলিয়ে পবিত্র আল আকসা মুসলমানদের কাছে খুবই গুরুত্বপূর্ণ একটি মসজিদ।এই পবিত্র বায়তুল মোকাদ্দাস মসজিদের আশপাশে জড়িয়ে রয়েছে অনেক নবি রাসূলের স্মৃতি। এখানেই রয়েছে অসংখ্য নবী রাসূলের রওজা মোবারক।এজন্যই মুসলমানরা এ মসজিদটিকে ইসলামিক জীবনে খুবই গুরুত্বপূর্ণ মনে করে। আল আকসার সবচেয়ে বিশেষত্ব হচ্ছে হিজরী সনের পরবর্তী প্রায় সতেরো মাস এটাকে ক্বিবলা হিসেবে ব্যবহার করেছে এবং পরে আল্লাহ তায়ালার নির্দেশ মোতাবেক এটা পরিবর্তিত হয়ে কাবা শরিফ কে ক্বিবলাা রূপান্তর করা হয়। ঐতিহাসিকদের মতে, আল আকসা মসজিদ মূলত তৈরি করেন হযরত আদম (আ:) তারপর অন্যান্য নবি রাসূলেরা বিভিন্ন সময় এটা মেরামত এবং পুণঃনির্মান করেন। ৬৩৮ সালে বায়তুল মোকাদ্দাস এলাকা মুসলমানের দখলে আসে।সে সময় মুসলমান শাসকরা কয়েকবার মসজিদ নিজ দায়িত্বে সংস্কার করেন।বিভিন্ন মুসলিম শাষকের আমলে মসজিদের সৌন্দর্য বর্ধনের লক্ষ্যে অনেক কিছু সংযোজন করা হয় যার মধ্যে মিনার,গম্বুজ,মেম্বর,আঙ্গিনা ইত্যাদি উল্লেখযোগ্য।
পরবর্তূতে ১৯৬৭ সালের দিকে অবৈধভাবে গড়ে ওঠা দখলদার এবং অবৈধ রাষ্ট্র ইসরায়েল পবিত্র মসজিদ আল আকসা কে দখল করে।কিন্তু মুসলমানেরা এটাকে আজও মেনে নেয় নি।এরপর থেকে ফিলিস্তিনের মুসলমানেরা মসজিদটি কে উদ্ধারের জন্য লড়াই করেছে যাচ্ছে জায়নবাদী ইসরায়েলের বিরুদ্ধে এবং এই আন্দোলন করতে গিয়ে ইসরায়লী আগ্রাসনের স্বীকার হচ্ছে স্বাধীনতাকামী ফিলিস্তিনি মুসলমান ভা ও বোনেরা। ফিসিল্তিনের স্বাধীনতাকামী আন্দোলেন নেতৃত্ব দিচ্ছে দেশটির বৃহৎ ইসলামী সংগঠন হামাস।গাজা উপত্যাকা কে নিয়ন্ত্রন করে হামাস। হামাসের স্বাধীনতাকামী আন্দোলনকে সমর্থন করেছে জাতীসংঘ। জাতীসংঘের সমর্থনের পরে ১৯৭৯ সাল থেকে প্রতি রমজান মাসের শেষ দশকে পালন করা হয় আল কুদস দিবস। প্রতি বছর পবিত্র রমজান মাসের শেষ দশকে মসজিদটি মুসল্লি দ্বারা পূর্ণ থাকে।

Post a Comment