সারা বিশ্বে জনপ্রিয়তার শীর্ষে অবস্থান করছে তুর্কি নির্মিত বিভিন্ন সিরিজ। গত কয়েক বছর ধরে আমেরিকা,আর্জেন্টিনা,পাকিস্তান,ভারত সহ প্রায় ১৬০ টিরও বেশি দেশে প্রচারিত হচ্ছে এসব সিরিজ।কেন এত জনপ্রিয় তুর্কি সিরিয়াল তা নিয়ে আমাদের আজকের রকমারি লিখেছেন আব্দুল আজিজ আহমেদ।
বিশ্বজুড়ে নিজস্ব টেলিভিশন অনুষ্ঠান সম্প্রচারের দিক দিয়ে আমেরিকার পরে তুরস্কের অবস্থান দ্বিতীয়তম অবস্থানে।এমনকি রাশিয়া,চীন,কোরিয়া এবং লাথিন আমেরিকায়েও রয়েছে এসব সিরিয়ালের ব্যাপক চাহিদা।বর্তমানে ডিজির সবচেয়ে ক্রেতা গ্রাহক হচ্ছে চিলি।চিলি ছাড়া ডিজি ক্রেতা হিসেবে তালিকায় আছেন আর্জেন্টিনা এবং মেক্সিকো। ডিজি বলতে বেঝানো হয় অতীত ইতিহাস কে সামনে তুলে ধরা,যার উৎকৃষ্ট উদাহরণ হচ্ছে তুর্কের নির্মিত বিভিন্ন ঐতিহাসিক সিরিয়াল।তুর্কি বিভিন্ন সিরিয়ালে মনোমুগ্ধকর ব্যবহার, সংগীত আয়োজন,রীতিনীতি,শব্দের ব্যবহার,মিউজিক,সুন্দর ভাব ভঙ্গিমা সব মিলিয়ে এসব সিরিয়ালের প্রতি মানুষের আকর্ষণীয় হয়ে উঠছে।তুরস্কে বেশিরভাগ ডিজির শ্যুটিং হয় ইস্তাম্বুলে।পাশাপাশি ব্যবহৃত হয় নিজস্ব ডিজিটাল স্টুডিও।প্রতিটি সিরিজের একেকটি পর্ব চলে প্রায় দুই ঘন্টা বা তার চেয়েও বেশি।তুরস্কের নির্মিত বিভিন্ন সিরিয়ালের মধ্যে জনপ্রিয় কিছু সিরিজ হচ্ছে দিরিলিস আর্তগ্রুল,কুরুলুস উসমান,পায়িতাথ আবদুল হামিদ,সুলতান সুলেমান ইত্যাদি।
২০১১ সালের দিকে তুরস্ক নির্মান করে অটোম্যান সাম্রাজ্যের সুলতানের প্রেম ও বৈবাহিক জীবন সম্পর্কিত নিয়ে একটি ঐতিহাসিক ডিজি।
উক্ত ডিজিটি প্রচারিত হওয়ার পরে দাবি করা হয় সেই সময়ে দেশের এক-তৃতীয়াংশ দর্শক এই কারণে টিভির প্রতি আকর্ষিত হয়েছিল।আন্তর্জাতিক বিভিন্ন গণমাধ্যম এই সব তুর্কি নির্মিত সিরিয়াল কে।গেম অব থ্রোন হিসেবে আখ্যা দেয়।
বিশ্বের বিভিন্ন দেশের ন্যায় বাংলাদেশ,ভারতেও বেশ জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে এসব সিরিজ।দেশের বিভিন্ন বেসরকারি টিভি চ্যানেল তুরস্কের এসব সিরিজ ডাবিং করে প্রচার করে আসছে এবং দর্শকরা এগুলো কে ভালোভাবেই গ্রহণ করেছে।তুর্কি সিরিজগুলোর মধ্যে সবচেয়ে জনপ্রিয় ডিজি হচ্ছে দিরিলিস আর্তগ্রুল মূলত জনপ্রিয় এই সিরিয়াল দেখার মধ্য দিয়েই বাংলাদেশে তাদের জাগরণ ঘটেছে যার ফলে তাদের নির্মিত অন্যান্য সিরিজের প্রতি আকৃষ্ট হচ্ছে
সেগুলোকেও খুব ভালো ভাবে গ্রহণ করছে বিশাল এক অংশ।ঐতিহাসিক দিরিলিস আর্তগ্রুল কে গেইম অব থ্রোন বলে উল্লেখ করা হয় এবং সিরিজটি এতই সাড়া ফেলে যে খুব দ্রুত রেকর্ড বুকে স্থান করে নেয়।দিরিলিস আর্তগ্রুলে অভিনীত আর্তগ্রুল গাজীর ছেলে উসমানের নামে চলছে এখন কুরুলুস উসমান যা বাংলালিংক টফি এপসের মাধ্যমে ডাবিং করে প্রচার করা হচ্ছে।টফি এপস ছাড়াও বেশ কিছু ইউটিউব চ্যানেল ও ফেসবুক পেজ যেমন আযমী পথিক,আর্তগ্রুল অনুবাদ,উসমানীয় সাম্রাজ্যের পুনরুত্থানের পক্ষ থেকে এসব সিরিয়ালগুলো কে ডাবিং অথবা সাবটাইটেল অনুবাদের মাধ্যমে প্রচার করা হচ্ছে এবং খুব সাড়া জাগাচ্ছে এসব।
২০১৫ সালে দীপ্ত টিভিতে প্রচারিত হতে শুরু করে ‘সুলতান সুলায়মান’ এবং তা খুব সময়ে বিপুল পরিমাণ সাড়া জাগিয়ে তোলে।এ বিষয়ে বিবিসিকে দীপ্ত টিভির প্রধান নির্বাহী কাজী উরফি আহমেদ একটি সাক্ষাতকার দেন।
উক্ত সাক্ষাতকারে তিনি উল্লেখ করে, ‘সব ধরনের সিরিয়াল পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে প্রচার করা হয়। আর এসব সিরিয়াল জনপ্রিয়তা অর্জন করে খুব তাড়াতাড়ি । আমরা মূলত এ বিষয়টাকে মাপকাঠি হিসেবে বিবেচনা করি। তা ছাড়া আমরা আমাদের চ্যানেলের দর্শকদের মধ্যে এক ধরনের জরিপ চালিয়ে বোঝার বেঝার চেষ্টা করি যে দর্শক তারা কী ধরনের কন্টেন্ট পেতে আগ্রহী।’ কোনো এক সময় বাংলাদেশের সরকারী চ্যানেল বিটিভিতে পাশ্চাত্যের বিভিন্ন প্রকারের সিরিয়াল ফলাওভাবে প্রচার করা হতো। সেগুলোর অনেক সিরিজ কখনা বাংলায় ডাবিং করা হতো আবার কখনো বা ইংরেজিতেই ডাবিংয়ের পাশাপাশি সাব টাইটেল আকারে প্রচার করা হতো।দেখা গেছে সেসব প্রচারিত সিরিয়াল অন্যান্য দেশীয় সিরিয়ালের চেয়ে বেশি জনপ্রিয়তার সাথে গ্রহণ করেছে ইসলাম প্রিয় জনতা। সেসব প্রচারিত সিরিয়াল বেশ দর্শক প্রিয়তাও অর্জন করেছিল। কিন্তু এখন পাশ্চাত্যের পরিবর্তে স্থান দখল করেছে মধ্যপ্রাচ্য ভিত্তিক নির্মিত বিভিন্ন ইসলামিক টিভি সিরিয়াল।প্রথম দিকে পাশ্চাত্যের নির্মিত সিরিয়াল বিনামূল্যে অথবা সুলভমূল্যে পাওয়া গেলেও এখন পরিস্থিতি ভিন্ন।কন্টেন্ট কপিরাইট আইন কঠোর হওয়ার কারণে এসব সিরিয়াল প্রচারের জন্য দেশে আনতে অনেক টাকা খরচ করতে হয়।খরচ হলেও তুরস্কের নির্মিত ডিজি প্রচার করে ব্যাপক লাভবান হওয়া সম্ভব।
বিশ্ব ময় কোটি কোটি দর্শকের মধ্যে বিশেষ করে মুসলিম দেশগুলোতে মধ্যে বাংলাদেশ বেশ এগিয়ে
আমরা জানি বিশেষ করে মুসলিমদের মধ্যে এসব ডিজির জনপ্রিয়তা অনেক বেশি।অনেকে একই সাথে অতীত ইতিহাস অন্যদিকে বিনোদন নেওয়ার নিমিত্তে এসবের প্রতি বেশ আকৃষ্ট হচ্ছে। আমাদের বাংলাদেশ মুসলিম প্রধান এবং এদেশের জনগণ ধার্মীক হওয়ায় তুর্কি সিরিয়ালের অনেক ঝুঁকে।পরেছে। যদিও ১৯৭১ এ মহান মুক্তি যুদ্ধের পরে আধুনিক বিশ্বায়নের ফলে এদেশের অধিকাংশ জনগণ,
ইসলাম বিদ্বেষী দের দ্বারা প্রভাবিত হয়ে ধর্মনিরপেক্ষ এবং ইসলাম সাংঘর্ষিক সংবিধান মোন্য করে আাছে তবুও মুসলিম শাসক, মধ্যপ্রাচ্যের মুসলিম সমাজের স্মরণীয় ইতিহাস, তাদের জীবন ধারা এসব বিষয় দর্শকদের কাছে খুবই কৌতূহলের সাথে গ্রহণ করার প্রবণতা লক্ষ্য করার মতো। এ বিষয়ে বিশ্লেষক রা মনে করেন, মধ্যপ্রাচ্য ভিত্তিক এসব সিরিয়ালের নির্মাণশৈলী এবং কাযকারী বাংলাদেশের অনেক বড় বড় অনুষ্ঠানের চেয়ে অনেক গ্ণ এগিয়ে এবং যেকোনো সময় সাড়া জাগাতে সক্ষম। এর কারণ হচ্ছে এসব সিরিজে ইসলামের ইতিহাস এবং ইসলামী জীবনধারা, ইসলামিক চরিত্র নিমিষেই ইসলাম প্রিয় জনতাকে আকৃষ্ট করতে সক্ষম।
বাংলাদেশে এই সব সিরিজের প্রভাব কে সুদূরপ্রসারী বলা যায়।প্রথম দিকে সুলতান সুলায়মান প্রচার শুরু করার পর থেকে দেশজুড়ে লাখো জনতা নাটক টি নিয়মিত দেখা শুরু করে। এই সিরিজের আকাশচুম্বী জনপ্রিয়তা দেখে বুষ্মিত হয়ে মাছরাঙা টেলিভিশন প্রচার শুরু করে দিরিলিস এরতুগ্রুলের এবং তারা আরো বেশি জনপ্রিয়তা অর্জন করে। মাছরাঙ্গা টিভির পাশাপাশি দীপ্ত টিভিতে জনপ্রিয়তার কাতারে আছে ‘ফেরিহা’ এবং এটিএন বাংলায় আছে প্রচারিত জান্নাত।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় টেলিভিশন এবং চলচ্চিত্র অধ্যয়ন বিভাগের অধ্যাপক মুহাম্ম শফিউল আলম ভূঁইয়া বিবিসি বাংলার এক সাক্ষাতকারে বলেছিলেন, ‘এ দেশের বিশাল অংকের দর্শক নিমিষেই জনপ্রিয় এসব তুর্কি সিরিজের বিষয় বস্তুর সঙ্গে নিজেদের মনের এক ধরনের সংযোগ স্থাপন করতে পারেন মুহুর্তেই। যার কূরণে সিরিয়াল গুলো দর্শকদের কাছে তুমুল জনপ্রিয়তা পাচ্ছে। এ যথার্থ কারণ হচ্ছে মধ্য প্রাচ্যে বেশিরভাগ মুসলিম সম্প্রদায়ের মানুষ বস বাস করে আর বাংলাদেশেও মুসলিম প্রধান হওয়ায় এদেশের নব্বই শতাংশ জনগণ ইসলাম প্রিয় হওয়ায় এক ধরনের মনস্তাত্ত্বিক নৈকট্যের কারণে কাছাকাছি বোধ করে। এটা থেকেই মূলত এ সংযোগ তৈরি হয়।তিনি আরো বলেন,বর্তমানে এসব সিরিজের জনপ্রিয়তা ও দর্শক যেভাবে বাড়ছে এভাবে চলতে থাকলে তবে দেশের সব অনুষ্ঠান কে কাটাতে সক্ষম হবে।
বাংলাদেশের পাশাপাশি পাকিস্তানেও খুব জনপ্রিয় স্থানে আছে এসব সিরিয়াল। স্বয়ং পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী ইমরান খান এই সিরিয়াল গুলো বেশি বেশি প্রচারের জন্য উৎসাহের সাথে অনুমতি দিয়েছেন। পাকিস্তানে সব সিরিজের উর্দু ডাবিং করে প্রচার করা হয়।দিরিলিস এরতুগ্রুল আসলে এতটা জনপ্রিয়তার শীর্ষে উঠেছে যে, যা গেম অব থ্রোনস চিন্তাও করতে পারেনি। শুধু এরতুগ্রুলই নয়, তুর্কি নির্মিত ডিজি গুলোর সব সিরিজ বতমানে ব্যাপক সাড়া জাগাচ্ছে,সব গুলো কেই ভালো ভাবে গ্রহণ করছে ডিজি প্রেমীক জনতা।
পাকিস্তানের মতো ভারতের ইসলাম প্রিয় জনতার মাঝেও অতি অল্প সময়ে ছড়িয়ে পরেছে তুর্কি সিরিজের ব্যাপক জনপ্রিয়তা।ভারতে হিন্দি ডাবিং করে বিভিন্ন ইউটিউব চ্যানেল এবং ফেসবুক পেজে প্রচার করা হচ্ছে।সব মিলিয়ে সারা বিশ্বে এসব সিরিয়াল যেভাবে জনপ্রিয়তা অর্জব করছে তা সত্যিই অভাবনীয়।

Post a Comment