সপ্তাশ্চর্যের রহস্য।সপ্তাশ্চর্য সম্পর্কে জানলে অবাক হবেন আপনিও

 

সারা বিশ্বের সপ্তাশ্চর্য

বিষ্ময়কর এ পৃথিবীতে সুনিপুণ ও নয়নাভিরাম নানান চিত্তাকর্ষক স্থাপনা থাকলেও  দ্য সেভেন ওয়ান্ডারস হচ্ছে বেশি আলোচিত আশ্চর্যজনক প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন। 

'সপ্তমাশ্চর্য' শব্দটি আমরা প্রায় শুনে থাকি।কিন্তু আমরা কি ভেবে দেখি কি এই প্রাচীন সপ্তমাশ্চর্য?

মূলত এই বিষ্ময়কর কৌতূহলপ্রবণ বিষয় নিয়েই আজকের রকমারি লিখেছেন Abdul Aziz Ahmed. 



সুন্দর এ পৃথিবীর বিভিন্ন পথে-প্রান্তে ছড়িয়ে ছিটিয়ে রয়েছে আজব ও বিষ্ময়কর স্থাপত্য ও নিপুণ শিল্পকর্ম।

প্রাচীনকালে এরকম প্রায় দুইশতটি সুন্দর ও নিপুন স্থাপনার তালিকা তৈরি করা হয়েছিল এবং সেখান থেকে বাছাইপূর্বক নতুন সাতটি নিদর্শন কে বেছে নিয়েছিলেন সুইস সংস্থা New Seven Wonders Foundation.‘প্রাচীনকাল’ বলতে আমরা পুরাকাল বা আদিযুগের সময়কাল কে বুঝি যে সময় পৃথিবী এবং মানুষ এতটা উন্নত ছিল না। 

আর সপ্তমাশ্চর্য শব্দটি ভাঙ্গলে দাঁড়ায় সপ্তম+আশ্চর্য অর্থাৎ প্রাচীন সাতটি বিষ্ময়কর নিদর্শন।যেসব নিদর্শন দেখলে বা এ সম্পর্কে জানলে একজন মানুষ পুরো আশ্চর্য হয়ে যাবেন।

প্রাচীন যুগে সূদুর গ্রিসের হেলেনীয় সভ্যতার পর্যটকরা সর্ব প্রথম সপ্তমাচর্যের বিষয়টি সামনে আনেন।তারাই মূলত সর্বপ্রথম পৃথিবীর এই সাতটি বিষ্ময়কর স্থাপনার তালিকা তৈরি করেন যেগুলো কে আমরা সপ্তমাশ্চর্য হিসেবে জানি।আজকে আমরা এ বিষয়ে জানবো।


১. চীনের মহাপ্রাচীর বা গ্রেট ওয়াল অব চায়নাঃ


চীনের মহাপ্রাচীর হচ্ছে সপ্তমাশ্চর্যের মধ্যে একটি অন্যতম স্থাপনা যা এ পর্যন্ত বিশ্বে মানুষের হাতে নির্মিত সর্ব বৃহৎ সুউচ্চ প্রাচীর।গ্রেট ওয়াল অব চায়না ২০০৭ সালে এটি সপ্তমাশ্চর্যের স্বীকৃতি পায়।

চীনের উত্তর সীমান্ত কে রক্ষা করার জন্য মূলত এ প্রাচীরটি তৈরি করেছিল বিভিন্ন রাজবংশীয় লোকেরা।এই মহাপ্রাচীর তৈরিতে অনেক রাজবংশ অংশ নিয়েছিলেন।এই মহা প্রাচীর টি চীনের বিভিন্ন জায়গায় ভিন্ন ভিন্ন নামে পরিচিত।চীনের মহা প্রাচীর টি চীনের প্রথম সম্রাট কিনসি হুয়াভের তত্ত্বাবধানে সর্বপ্রথম নির্মিত হয়েছিল।

২০১২ সালে চীনের রাষ্ট্রীয় সংস্কৃতি অধিদপ্তর ঘোষণা করেন যে বিভিন্ন রাজবংশের নির্মিত এই বিখ্যাত প্রাচীরের দৈর্ঘ্য প্রায় ২১,১৯৬ কিলোমিটার এবং মিং রাজবংশের নির্মিত গ্রেট ওয়ালের দৈর্ঘ্য ৮৮৫১ কিলোমিটার অন্যদিকে বেইজিংয়ের নির্মিত পরিমাণ ৫২৬ কিলোমিটার। প্রাচীরটির উচ্চতা ৪-৯ মিটার এবং চওড়া প্রায় ৯ মিটারের বেশি। 



প্রায় ২০০ বছর এই মা প্রাচীরটি নির্মানে কাজ করে এসেছিলেন মিং রাজবংশের লোকেরা। অবশ্য তার আগেও অনেক রাজ বংশের লোকেরা এটা তৈরিতে সময় শ্রম দিয়েছিল।এর নির্মাণ কাজে প্রায় দশ লাখের বেশি সাধারণ মানুষ, শ্রমিক এবং সৈন্যরা অংশ নিয়েছিলেন।এটি তৈরিতে উপাদান হিসেবে ব্যাবহিত হয়েছে পাথর, কাঠ, ইট, বালি ও মাটি।

শত্রু ও সীমান্তবতী অঞ্চকে নজরদারী রাখার প্রা জন্য ৭২৩ টি বীকন টাওয়ার,৭০৬২ টি লুকানো টাওয়ার,৩৩৫৭ টি ওয়াল প্লাটফর্ম রয়েছে এই প্রাচীরে।


২. তাজমহলঃ

সপ্তাশ্চর্যের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা হচ্ছে তাজমহল।২০০৭ সালে এটি সপ্তমাশ্চর্যের স্বীকৃতি লাভ করে।


এটি মূলত ভারতের উত্তর প্রদেশের আগ্রায় অবস্থিত একটি রাজকীয় সমাধি। মুঘল সম্রাট শাহজাহান তার স্ত্রী মমতাজের স্মৃতিচারণে এটি নির্মান করেন যার উচ্চতা প্রায় ৭৩ মিটার।২২ হাজারের বেশি শ্রমিক রাতভর পরিশ্রম করে এই স্থাপনাটি তৈরি করেন।

তাজমহল তৈরি করতে সম্রাটের খরচ হয়েছে প্রায় ৩২ মিলিয়ন টাকা যা বর্তমানে বাজারে ৫২.৮ বিলিয়ন সমপরিমাণ।এর সুন্দর ও নিপুত কারুকার্য উপভোগ করার জন্য প্রতিবছর দেশ বিদেশ থেকে কোটি কোটি দর্শনার্থী ভিড় জমায়।

অনিন্দ্য সুন্দর ও নিপুণ স্থাপনা হওয়ায় ইউনেস্কো ১৯৯৩ সাকে এটিকে ঐতিয‍্যবাহী স্থান হিসেবে চিহ্নিত করেছে।




৩. মাচুনিচুঃ

পেরুর সবচেয়ে বিষ্ময়কর দর্শনীয় স্থান হচ্ছে মাচুনিচু। এটি সমুদ্র পৃষ্ট থেকে প্রায় ২৪০০ মিটার উচ্চতায় দুটি পাহাড়ের সংযোগ স্থলে অবস্থিত।


জায়গাটি সুন্দর ও ঐতিহাসিক সাক্ষী হওয়ায় পেরু এটিকে সংরক্ষিত ঐতিহাসিক এলাকা হিসেবে ঘোষণা করেন।এই শহরটিতে পুরনো ধ্বংসাবশেষ ছাড়াও রয়েছে বিভিন্ন প্রাকৃতিক উদ্ভিদ ও জীবজন্তু। ১৯৮৩ সালে ইউনেস্কো এটিকে ঐতিহ্যবাহী এলাকা হিসেবে ঘোষণা করেন এবং ২০০৭ সালে এটি সপ্তমাশ্চর্যের তালিকায় উঠে আসে।



৪. পেত্রাঃ

পেত্রা হচ্ছে সম্তমাশ্চর্যের মধ্যে অন্যতম আরেকটি নিদর্শন।জর্ডানের একটি প্রত্নতাত্ত্বিক শহর হিসেবে পেত্রা খ্যাতিমান।

এটি মূলত জর্দানের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের একটি গ্রামে অবস্থিত  হুর নামক পাহাড়ের প দ ত লে অবস্থিত। পেত্রার সর্বমোট দৈর্ঘ্য প্রায় ২৬৪ বর্গ কিলোমিটার অঞ্চল জুড়ে এবং উচ্চতা প্রায় ৮১০ মিটার।নিপুন নির্মানশীলতা এবং অনিন্দ্য সুন্দর এই শহরে

 পাথরে খোদাই করে তৈরি করা হয়েছে সুরম্য অট্টালিকা।১৮১২ সালে এই শহরটির অস্তিত্ব আবিষ্কৃত হওয়ার পর ইউনেস্কো এটিকে বিশ্ব ঐতিহ্যের অন্তর্ভুক্ত করে।


৫. কলোসিয়ামঃ 

কলোসিয়াম হচ্ছে বিশ্বের আরেকটা বিষ্ময়।ল্যান্ড অব মার্বেল বা মার্বেলের শহর হিসেবে বিশ্বে এটি সমোধিক পরিচিত।এটি ইতালির রাজধানী রোমে অবস্থিত।

ইতিহাস থেকে পাওয়া যায়, ফ্লাভিয়ান বংশের সম্রাট ভেস্পাসিয়ান  এবং তার এক পুত্র সম্রাট তাইতাস ৭০-৮০ খ্রিস্টাব্দে এটি নির্মাণ করেন। এটি ফ্লাভিয়ান অ্যাম্ফি থিয়েটার নামেও বিশ্বে পরিচিত। 

এগ্লাডিয়েটর দের বিভিন্ন খেলা যেমন মল্লযুদ্ধ  এবং বন্য প্রাণীদের  বিভিন্ন ধরনের লড়াই প্রদর্শন করা হতো এখানে।খেলাধুলার পাশাপাশি বিনোদন উপভোগের জন্য এখানে নৌমঞ্চ ও তৈরি করা আছে।বিনোদন উপভোগের জন্য আরো ছিল গ্যালারির ব্যবস্থা যার ধারণক্ষমতা প্রায় ৫০,০০০ জন পর্যন্ত ছিল এবং উপরে ছিল দামি ও মনোরম রঙ্গের শামিয়ানা যা দর্শক বা শরণার্থীদের কে সূর্যের প্রখর রোদ থেকে রক্ষা করার কাজে ব্যবহৃত হতো।


দুর্ভাগ্যজনক বিষয় হচ্ছে,ভূমিকম্পসহ অন্যান্য প্রাকৃতিক দুর্যোগের কবলে পরে এর দুই-তৃতীয়াংশ ধ্বংস হয়ে গিয়েছে।ধ্বংসপ্রাপ্ত এই প্রত্নসম্পদ কে যথাযথ সংরক্ষণের উদ্যোগ নেওয়ায় আজ ১৯ শতকে।আজ অবধি এর সৌন্দর্য পর্যটকদের মন কাড়ে।



৬. ক্রাইস্ট দ্য রিডিমারঃ


ক্রাইস্ট দ্য রিডিমার ব্রাজিলের রিও ডি জেনেইরা শহরে অবস্থিত একটি যিশু খ্রিষ্টের ভাস্কর্য। ২০১৪ সালে ব্রাজিলে অনুষ্ঠিত ফুটবল বিশ্বকাপ ফাইনালের সুবাদে অনেকে সেটি দেখতে পেয়েছিলেন।


এই ভাষ্কর্য টি অত্যন্ত সুগঠিত একটি উচু পর্বত আর স্বচ্ছ নীল জল রাশিতে ঘেরা রয়েছে। এই মূর্তিটি ফ্রান্সের আইফেল টাওয়ার এবং যুক্তরাষ্ট্রের স্ট্যাচু অব লিবার্টির মতো ব্রাজিলের প্রতীকী তাৎপর্য বহন করে।মূলত, প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পর ব্রাজিলিয়ানের কিছু ক্যাথলিক এটি নিরৃমানের সিদ্ধান্ত নেন এবং সিদ্ধান্ত মোতাবেক তা নির্মান করেন।এটি নির্মানে তারা আর্থিক তহবিল পর্যন্ত তৈরি করেছিল যার কারণে ভাষ্কর্য টি তফরি করা তাদের পক্ষে সম্ভব হয়েছিল। ভাষ্কর পল ল্যান্ডোস্কি এর নকশা প্রণয়ন করলে সেই অনুযায়ী ১৯২৬-১৯৩১ সালে এটির  নির্মান কাজ সম্পন্ন হয়। 

। ৯৮ ফুট উঁচু  এ ভাস্কর্যটির ৩০ ফুট বেদী এবং ৬৮ ফুট মূর্তিটি  কনক্রিট এবং অনেক টাইলসের সমন্বয়ে তৈরি করা হয়েছে।



৭. চিচেন ইৎজাঃ 

চিচেন ইতজা একটি নয়নাভিরাম দ্বীপীয় শহর যা মায়ান সভ্যতার পরিচয় বহন করে ।এটি একটি আকর্ষণীয় পর্যটনকেন্দ্র হিসেবে বিবেচিত।এই আকর্ষণীয় চিচেন ইৎজা মেক্সিকোর ইয়ুকাতান নামের একটি উপদ্বীপে অবস্থিত। 

প্রায় ৬-১২শ শতাব্দী পর্যন্ত এই চিচেন ইৎজা তাদের (মায়ানদের) জন্য  সাংস্কৃতিক ও অর্থনৈতিক কেন্দ্র হিসেবে কাজ করে আসছিল। চিচেন ইৎজা ছাড়াও এল ক্যাসিলো নামের একটি পিরামিডের জন্যও এই শহরটি আরো বেশি ঐতিহাসিক পর্যটনকেন্দ্র হিসেবে আলোচিত।

সৌর বছরের অনুকরণে এখানে ৩৬৫ টি সিড়ি তৈরি করা আছে যা জ্যোতির্বিজ্ঞান শাখায় মায়ানদের উৎকর্ষতা সাক্ষ্য প্রমাণ হাজির করে দেয়। সূর্যের তাপ ও আলোতে সেই সিড়িগুলো সর্পিল বর্ণ ধারণ করে যা দেখতে অত্যন্ত বিশ্ময়কর বটে।সর্পিল বর্ণ ধারণ করা এই সিড়িগুলো দেখতে দেশ বিদেশ থেকে পাড়ি জমান অজস্র পর্যটক।


Post a Comment

Previous Post Next Post