১৯৭৭ সালে যাত্রা শুরু, ৪৯ বছর ধরে আজও থামেনি ভয়েজার-১। আর কতদিন চলবে এই মহাকাশযান?

পৃথিবীর ইতিহাসে প্রথমবারের মতো একটি মানবসৃষ্ট বস্তু আলোক দিবসে পৌঁছাবে! কি অবাক লাগছে?

আমরা জানি, এই মহাকাশের বিশালতার মাঝে আমাদের পৃথিবীটা যেন এক ক্ষুদ্র নীল বিন্দু। এই ক্ষুদ্র পৃথিবী থেকে উৎক্ষেপিত একটি ছোট্ট মহাকাশযান ধীরে ধীরে অনবরত এক দূরত্বে পৌঁছাচ্ছে, যা কয়েক দশক আগেও মানুষ কল্পনা করতে পারে নি। মানবসভ্যতার ইতিহাসে এই প্রথমবারের মতো মানুষের তৈরি বস্তু এক আলোক দিবস (Light-Day) দূরত্ব অতিক্রম করার পথে যাচ্ছে। এটা হবে একটা মাইলফলক।বস্তুটির নাম হচ্ছে ভয়েজার–১ (Voyager 1)। 

Credit: NASA/JPL-Caltech  ছবি: ভয়েজার-১

ভয়েজার-১ যানটির যাত্রা শুরু হয়েছিল প্রায় অর্ধশতাব্দী বছর আগে যা আজও বিরামহীনভাবে ছুটে চলছে মহাবিশ্বের অজানা মহাশূন্যের পথে। এটি বর্তমানে আমাদের এই পৃথিবী থেকে এতটাই দূরে চলে গেছে যে, তার পাঠানো সংকেত পৃথিবীতে আসতে সময় লাগে প্রায় একদিন অর্থাৎ ২৪ ঘন্টা। এই যে একটা অসাধারণ অর্জন এটি নিছক প্রযুক্তিগত সাফল্য নয় বরং এটি মানবজাতির সাহস, জ্ঞানকে অনুসন্ধান এবং বিশাল এই মহাবিশ্বকে জানার অদম্য আকাঙ্ক্ষার প্রতীক ও মাইলফলক।


আলোক দিবস ও আলোকবর্ষ কী?

আলোক দিবস বলতে বুঝানো হয় আলো এক দিনে কতটা দূরত্ব অতিক্রম করতে পারে তার পরিমাণ। সোজা কথায় ২৪ ঘণ্টায় আলো যতদূরত্ব অতিক্রম করে তাই হচ্ছে আলোক দিবস। আর ৩৬৫ দিনে আলো যতটুকু অতিক্রম করে সেই পরিমাণ কে বলে এক আলোক বর্ষ বা One Light Year. আমরা জানি, আলোর গতি শূন্যস্থানে প্রতি সেকেন্ডে প্রায় তিন লক্ষ (২৯৯,৭৯২) কিলোমিটার। সুতরাং, এটি প্রমাণিত যে আলো প্রতি সেকেন্ডে পৃথিবীকে প্রায় ৭.৫ বার প্রদক্ষিণ করতে সক্ষম।এই নির্দিষ্ট গতিতে আলো এক দিনে প্রায় ২৫.৯ বিলিয়ন কিলোমিটার পথ অতিক্রম করে থাকে। আর এই বিশাল দূরত্বকেই বিজ্ঞানের ভাষায় এক আলোক দিবস বলা হয়ে থাকে। মহাকাশে দূরত্ব পরিমাপের জন্য সাধারণত কিলোমিটার একক অনেক অনেক ক্ষেত্রে যথেষ্ট নয়। এই কারণে বিজ্ঞানীরা আলোক সেকেন্ড, আলোক মিনিট, আলোক ঘণ্টা এবং আলোকবর্ষের মতো চমৎকার কিছু একক ব্যবহার করে থাকেন। এক আলোক দিবস শব্দটি শুনতে অনেক ছোট মনে হলেও এটি আমাদের মানুষের তৈরি করা কোনো বস্তুর জন্য সত্যিই অবিশ্বাস্য দূরত্ব।


ভয়েজার–১: মানবজাতির দূত

সাল ১৯৭৭। সেপ্টেম্বরের ৫ তারিখ। যুক্তরাষ্ট্রের মহাকাশ গবেষণা সংস্থা NASA ভয়েজার–১ মহাকাশযানটি কে মহাকাশে উৎক্ষেপণ করে। ভয়েজারকে প্রেরণের মূল উদ্দেশ্য ছিল সোলার সিস্টেম তথা সৌরজগতের বাইরের গ্রহগুলো সম্পর্কে তথ্য সংগ্রহ করা এবং সেগুলো পৃথিবীতে প্রেরণ করা। তখন মহাকাশ বিজ্ঞানীরা বুঝতে পেরেছিলেন যে বৃহস্পতি, শনি, ইউরেনাস ও নেপচুন এই গ্রহগুলোর একটি বিষ্ময়কর জ্যামিতিক অবস্থানে রয়েছে। তারা মূলত এই অবস্থানকে কাজে লাগিয়ে একটি ছক তৈরি করেন যাতে মহাকাশযান কম জ্বালানিতে একাধিক গ্রহ পরিদর্শন করতে পারবে এমন নিশ্চয়তা তৈরি করে এবং এই সুযোগ শত শত বছরের মধ্যে মাত্র একবার আসে। ভয়েজার–১ এবং এরই যমজ আরেকটি মহাকাশযান ভয়েজার–২ কে সেই ঐতিহাসিক অভিযানের অংশ হিসাবে পাঠানো হয় মহাকাশে।


বৃহস্পতি ও শনির গ্রহের বিস্ময়:

ভয়েজার–১ প্রথমে বৃহস্পতি গ্রহের কাছে পৌঁছানোর পরে গ্রহটির অসাধারণ চিত্র ও তথ্য পাঠিয়েছিল। এর মাধ্যমে বৃহস্পতির বায়ুমণ্ডল, ঝড়, উপগ্রহ এবং এর চৌম্বক ক্ষেত্র সম্পর্কে অনেক গুরুত্বপূর্ণ তথ্য-উপাত্তর সংগ্রহ করে পৃথিবীতে পাঠায়। এর মাধ্যমেই মহাকাশ বিজ্ঞানীরা বৃহস্পতির উপগ্রহ আইও-তে সক্রিয় আগ্নেয়গিরির সন্ধান পেয়ে বিস্মিত হয়েছিল।


Image Source: Credit: NASA/JPL-Caltech—ভয়েজার-১ থেকে পাঠানো বৃহস্পতি গ্রহের চিত্র।

বৃহস্পতি গ্রহ শেষে পরবর্তীতে মহাকাশযানটি শনির দিকে এগিয়ে যেতে থাকে এবং শনির বলয়, তার বায়ুমণ্ডল এবং উপগ্রহ টাইটান সম্পর্কেও যুগান্তকারী তথ্য ও উপাত্ত পাঠিয়েছিল ভয়েজার-১ নামক যানটি। টাইটানে ঘন বায়ুমণ্ডলের অস্তিত্ব দেখেই বিজ্ঞানীরা বুঝতে পেরেছিলেন যে, এটি সৌরজগতের এক অন্যতম রহস্যময় জগৎ।গ্রহগুলো অনুসন্ধানের কাজ শেষ হওয়ার পরে কি ভয়েজার–১-এর মিশন শেষ হয়েছিল? উত্তর হচ্ছে না। বরং শুরু হয় আরও বড় একটি মহাজাগতিক যাত্রা।

মহাকাশযাটি আমাদের সৌরজগতের প্রান্তসীমার দিকে ছুটেছিল এবং এর লক্ষ্য ছিল সূর্য সম্পর্কে তথ্য সংগ্রহ এবং প্রভাববলয়ের বাইরের অঞ্চল সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ সব তথ্য সংগ্রহ করা।মহাকায় যাত্রার দীর্ঘ কয়েক দশকের পর ২০১২ সালে এটি (ভয়েজার–১) সৌরজগতের সীমানা পেরিয়ে আন্তঃনাক্ষত্রিক মহাশূন্যে প্রবেশ করে পৃথিবীর প্রথম মানবসৃষ্ট বস্তুতে পরিণত হওয়ার রেকর্ড গড়ে। এটি ছিল এমন একটি অঞ্চল যেখানে সূর্যের প্রভাব অনেকটাই দুর্বল এবং সেখানে আন্তঃনাক্ষত্রিক কণার প্রভাব ক্রমশ বাড়তে থাকে।

ভয়েজার-১ এর বর্তমান অবস্থান:

মজার ব্যাপার হচ্ছে ভয়েজার–১ বর্তমানে আমাদের পৃথিবী থেকে প্রায় ২৫ বিলিয়ন কিলোমিটারেরও বেশি দূরে অবস্থান করছে এবং এটি চলমান রয়েছে যা প্রতি সেকেন্ডে প্রায় ১৭ কিলোমিটার বেগে ছুটে চলেছে। এই দূরত্ব এতটাই বেশি যে উক্ত মহাকাশযান থেকে পাঠানো প্রতিটি রেডিও সংকেত পৃথিবীতে আসতে সময় লাগে প্রায় ২৩ ঘণ্টার বেশি সময় অর্থাৎ প্রায় একদিন। এর মানে দাঁড়ায় আপনি যদি আজকে ভয়েজার–১-এ কোনো বার্তা বা সংকেত প্রেরণ করে, সেটি ভয়েজারে পৌঁছাতে সময় নিবে একদিন। আবার সেখান থেকে প্রতিত্তর আসতেও প্রায় একদিনের মতোই সময় লাগবে। এভাবে পৃথিবী ও ভয়েজার দুইয়ের মধ্যে একটি সংকেত আদান-প্রদান করতে দুইদিন সময়ের প্রয়োজন হবে। এই কারণেই ভয়েজার–১ মহাকাশযানের এক আলোক দিবস পরিমাণ দূরত্বে পৌঁছানো ছিল একটি মহাজাগতিক গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক।

এক আলোক দিবস দূরত্ব কেন এত গুরুত্বপূর্ণ?

বিষ্ময়কর বিষয় হচ্ছে যে, ভয়েজার-১ এমন একটি মানবসৃষ্ট আকাশযান যা মানবসভ্যতার ইতিহাসে প্রথমবারের মতো এমন একটি দূরত্বে পৌঁছাবে যেখানে দৃশ্যমান আলো নিজেই যেতে সময় নেয় পুরো একদিন। অথচ আমরা জানি আলো প্রতি সেকেন্ডে প্রায় ৩ লক্ষ কিলোমিটার দ্রুত চলে। সুতরাং, এটি শুধু একটি সংখ্যাগত অর্জন নয়।এই সফল মিশনটি প্রমাণ করে যে,মানবজাতি বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির সহায়তায় এমনসব বস্তু তৈরি করতে সক্ষম হয়েছে, যা আমাদের সৌরজগতের গণ্ডি পেরিয়েও মহাবিশ্বের গভীরে প্রবেশ করতে পেরেছে। একসময় মানুষ ভাবত যে এই পৃথিবীর বাইরে যাওয়া সম্ভব নয় এ চাঁদে পৌঁছানোও অসম্ভব মনে করা হতো। আজ মহাকাশযান ভয়েজার এমন মাইলফলক পরিমান দূরত্বে পৌঁছাচ্ছে, যা কয়েক প্রজন্ম আগেও আমরা কল্পনা করতে পারতাম না, কল্পবিজ্ঞানের গল্প বলে মনে হতো তখন।

ভয়েজারের ভেতরে কী আছে?

ভয়েজার–১ কে শুধুমাত্র একটি বৈজ্ঞানিক যন্ত্র বললে ভুল হবে; এটি মানবসভ্যতার এক গুরুত্বপূর্ণ বার্তাবাহকও বটে।মহাকাশযানটির ভেতরে রয়েছে একটি বিশেষ কার্যকরী গোল্ডেন রেকর্ড (Golden Record)।

Credit: NASA/JPL-Caltech —ছবিতে Voyager Golden Record

উপরের ছবিটি হচ্ছে গোল্ডেন রেকর্ড আর পাশে চকচকে সোনালি রঙের এই ডিস্কটা হচ্ছে  Golden Record Cover। এটি Voyager 1 ও Voyager 2 আকাশযানে যুক্ত করা সেই বিখ্যাত সোনালী রঙের ফোনোগ্রাফ রেকর্ডের প্রতিরক্ষামূলক অ্যালুমিনিয়াম কভার বা ঢাকনা, যেখানে খোদাই করে লেখা আছে মহাজাগতিক নির্দেশনা — কখনো যদি কোনো ভিনগ্রহের সভ্যতা এটাকে খুঁজে পায়, তখন তারা যেন রেকর্ডটা কীভাবে বাজাতে হয় সেটা ভালোভাবে বুঝতে পারে এবং পৃথিবী সম্পর্কে জানতে পারে।

কভারে খোদাই করা আছে:
ফোনোগ্রাফ রেকর্ডটি বাজানোর সঠিক পদ্ধতির চিত্র (ক্যার্টিজ ও স্টাইলাস কীভাবে বসাতে হবে তার ব্যাখ্যা)
হাইড্রোজেন পরমাণুর হাইপারফাইন ট্রানজিশন (একটা সার্বজনীন "সময়/দৈর্ঘ্য" একক হিসেবে এটাকে পাঠানো হয়েছে।
পাশাপাশি ১৪টা পালসারের অবস্থান দেখানো হয়েছে একটা মানচিত্রের মাধ্যমে — যা দেখে ভিনগ্রহীরা বুঝতে পারবে যে স্পেসক্রাফটটা সূর্য থেকে কোথায় ও কখন পাঠানো হয়েছিল? এটার বয়স কতদিন হলো? পাশাপাশি যুক্ত আছে পৃথিবীর বিভিন্ন ভাষা সংবলিত শুভেচ্ছাবার্তা, মানুষের আসল কণ্ঠস্বর, প্রকৃতির শব্দ, সঙ্গীত এবং পৃথিবীর চমৎকার ও বিষ্ময়কর ছবি।

RTG কীভাবে কাজ করে?

RTG-এর ভেতরে রয়েছে তেজস্ক্রিয় প্লুটোনিয়াম-২৩৮ (Plutonium-238)। আমরা জানি প্লুটোনিয়াম ধীরে ধীরে ক্ষয় হয় এবং ক্ষয়ের সময় প্রচুর পরিমাণে তাপশক্তি উৎপন্ন করে। বিশেষায়িত থার্মোইলেকট্রিক যন্ত্র দিয়ে সেই তাপকে বিদ্যুৎশক্তিতে রূপান্তর করে ভয়েজার। সেই বিদ্যুৎ দিয়েই ভয়েজারের মধ্যকার কম্পিউটার, রেডিও ও বৈজ্ঞানিক যন্ত্রোতিগুলো চলমান। এটাকে অনেকটা "তেজস্ক্রিয় ব্যাটারি"র সাথে তুলনা করা যেতে পারে, কিন্তু এতে কোনো চার্জ দেওয়ার প্রয়োজন পড়ে না।

ভয়েজার–১ মহাকাশযানটিতে কোনো সৌর প্যানেল ব্যবহার করা হয় নাই। কারণ এটি এখন সূর্য থেকে এতটাই দূরে অবস্থান করছে যে সেখানে সৌরশক্তির অস্থিত্ব না থাকারই কথা।এর শক্তির অন্যতম উৎস হচ্ছে একটি Radioisotope Thermoelectric Generator (RTG)। এর মাধ্যমেই এটি আজও চলমান রয়েছে। বিষ্ময়কর ব্যাপার হচ্ছে এটি কিন্তু কোনো ধরনের জ্বালানি ব্যবহার করে সামনে এগোচ্ছে না। ভয়েজারকে উৎক্ষেপণের সময় প্রাথমিকভাবে রকেট ও গ্রহগুলোর মধ্যকার মহাকর্ষীয় সহায়তায় যে একটা গতি পেয়েছিল, সেই গতিকে কাজে লাগিয়েই এটি চলছে। বিজ্ঞানী নিউটনের প্রথম সূত্র অনুযায়ী এটি এভাবেই অবিরাম মহাশূন্যে চলতে থাকবে। অর্থাৎ একদিন ভয়েজারের সব যন্ত্র নিস্তব্ধ হয়ে যাবে, বিকল হয়ে পড়বে কিন্তু কোটি কোটি বছর ধরে মহাবিশ্বে ভেসে বেড়াতেই থাকবে—মানবসভ্যতার এক নীরব দূত হিসেবে।

কতদিন চলবে এই ভয়েজার-১?

তথ্যমতে ভয়েজার–১ কে উৎক্ষেপণের সময় এর ভেতরের RTG প্রায় ৪৭০ ওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন করেছিল। প্লুটোনিয়াম-২৩৮ পদার্থ ধীরে ধীরে ক্ষয় হতে থাকায় প্রতি বছরে শক্তি কিছুটা কমে যাচ্ছে এবং যাবে। এর ফলে নাসা একে একে অপ্রয়োজনীয় সব অপারেশন ও যন্ত্রপাতি বন্ধ করে দিয়েছে। ২০২৩ সালে ভয়েজার হঠাৎ করে সংকেত পাঠানো বন্ধ করেছিল, এতে বিজ্ঞানীরা চিন্তিত হয়ে পড়েছিলেন। তার ঠিক পাঁচ ৃমাস পরে আবারো সংকেত পাঠানো শুরু করে ভয়েজার-১।

Image Credit: NASA/JPL-Caltech —ছবিতে: ২৪ বিলিয়ন কিলোমিটার দূরে গিয়ে সংকেত পাঠানো বন্ধ করার পরে আবার সংকেত পাঠানো শুরু করলে নাসার বিজ্ঞানীরা তা উৎযাপন করছেন।

বর্তমানে কয়েকটি সীমিত ও প্রয়োজনীয় বৈজ্ঞানিক যন্ত্রপাতি সচল আছে। ধারণা করা হচ্ছে, ২০৩০ এর দশকের শুরুর দিকে মহাকাশযানটি তার শক্তি হারিয়ে ফেলবে, ফলে পৃথিবীর সঙ্গে তার যোগাযোগ সম্পূর্ণভাবে বন্ধ হওয়ার সম্ভাবনা আছে। এটি অবিশ্বাস্য হলেও সত্য, প্রায় ৫০ বছর আগে পাঠানো একটি পুরোনো এই মহাকাশযান এখনও নাসার বিজ্ঞানীদের সাথে নিবিড় যোগাযোগ রাখছে যা সত্যিই বিষ্ময়কর এক ঘটনা। ভয়েজার এখনো আন্তঃনাক্ষত্রিক মহাশূন্যে অবস্থান করে সেখানকার কণা, চৌম্বক ক্ষেত্র এবং বিকিরণ সম্পর্কে অনেক গুরুত্বপূর্ণ সংকেত ও তথ্য পাঠাচ্ছে। যেখন ভয়েজারের সাথে পৃথিবীর যোগাযোগ বন্ধ হয়ে থাকে, তখনো এটি চলমান থাকবে। অর্থাৎ বার্তা পাঠাবে না কিন্তু চলতেই থাকবে নীরবে, অন্ধকার মহাশূন্যের মধ্যে।

প্রশ্ন হতে পারে ভয়েজারের ভবিষ্যৎ গন্তব্য কোথায়?

উত্তর হচ্ছে আসলে ভয়েজার–১ এর কোনো নির্দিষ্ট গন্তব্য নেই এবং সেভাবেই এটাকে ডিজাইন করা হয়েছে। এটি অনির্দিষ্টকাল ধরে মহাকাশে ভেসে চলবে। প্রায় ৪০ হাজার বছর পথ চলার পরে এটি মহাকাশের দূরবর্তী নক্ষত্রের তুলনামূলক কাছাকাছি অংশ দিয়ে অতিক্রম করবে বলে বিজ্ঞানীদের ধারণা। তবে মহাজাগতিক স্কেলে "কাছাকাছি" শব্দটা বলতে কয়েক ট্রিলিয়ন কিলোমিটার দূরত্বও হতে পারে—যার নির্দিষ্ট কোনো সীমারেখা নেই।

মানব ইতিহাসের এক অনন্য অধ্যায়

ভয়েজার–১ এর এই মহাকাশ যাত্রা শুধু মাত্র একটি মহাকাশ মিশনের গল্পই নয়। এটি মানবসভ্যতা ও মানুষের কৌতূহল, আমাদের অনুসন্ধিৎসা এবং সীমাহীন সম্ভাবনার একটি গল্প। যে প্রাচীন সভ্যতা একদিন আমাদের কে আগুন জ্বালাতে শিখিয়েছিল, সেই সভ্যতাই হাজার বছরের বিবর্তনে এমন একটি বিষ্ময়কর যন্ত্রের আবিষ্কারের কৃতিত্ব অর্জন করেছে, যা তার নিজ গ্রহের সীমা পরিসীমা পেরিয়ে এক আলোক দিবস পরিমাণ দূরে যেতে চলেছে। আমাদের পৃথিবী থেকে প্রায় ২৬ বিলিয়ন কিলোমিটারের দূরের এই অভিযাত্রীটি নিছক একটি মহাকাশযান নয় বরং নিঃসন্দেহে এটি মানবজাতির সাহস, উদ্ভাবন এবং অজানাকে জানা-শোনার এক চিরন্তন আকাঙ্ক্ষার প্রতীক হিসেবে বিবেচিত।এই অর্জন আমাদেরকে স্মরণ করিয়ে দেয় যে,মানুষের সবচেয়ে বড় শক্তি হচ্ছে তার কল্পনা ও জ্ঞান অর্জনের ইচ্ছা ও অভিপ্রায়।

ইতিহাসে এই প্রথমবারের মতো একটি মানবসৃষ্ট বস্তু এক আলোক দিবস দূরত্বে পৌঁছানোর পথে। যা প্রায় পাঁচ দশক ধরে নিরলসভাবে মহাবিশ্বের গভীরে ছুটে চলছে। চলছে তো চলছেই। একদিন ঠিকই হয়তো এর সঙ্গে আমাদের যোগাযোগ বন্ধ হয়ে যাবে। কিন্তু ভয়েজার–১ তখনও ছুটে চলবে—তারার পথে, মহাবিশ্বের গভীর থেকে গভীরে, মানুষের গল্প বয়ে নিয়ে। আমাদের গল্প সাথে নিয়ে।

লিখেছেন: Abdul Aziz Arefin 


প্রশ্নোত্তর - FAQ

প্রশ্ন ১: ভয়েজার-১ কি?

উত্তর: ভয়েজার-১ হলো নাসার পাঠানো একটি মহাকাশযান যা ১৯৭৭ সালে উৎক্ষেপণ করা হয়। এটি সৌরজগতের বাইরে পৌঁছানো প্রথম মহাকাশযান।

প্রশ্ন ২: ভয়েজার-১ এখন কোথায় আছে?

উত্তর: ভয়েজার-১ এখন আন্তঃনাক্ষত্রিক মহাশূন্যে রয়েছে এবং পৃথিবী থেকে প্রায় ২৪ বিলিয়ন কিলোমিটার দূরে অবস্থান করছে।

প্রশ্ন ৩: ভয়েজার-১ এর সাথে কি এখনো যোগাযোগ করা যায়?

উত্তর: হ্যাঁ, নাসা এখনো ভয়েজার-১ এর সাথে যোগাযোগ রাখতে পারে এবং এটি থেকে তথ্য পাঠানো হচ্ছে। তবে সিগন্যাল পৌঁছাতে ২৩ ঘণ্টার বেশি সময় লাগে।

প্রশ্ন ৪: ভয়েজার-১ থেকে পৃথিবীতে সিগন্যাল আসতে কত সময় লাগে?

উত্তর: ভয়েজার-১ এখন অনেক দূরে। তাই পৃথিবী থেকে পাঠানো সিগন্যাল ওখানে পৌঁছাতে ২৩ ঘণ্টা লাগে। আবার উত্তর আসতেও ২৩ ঘণ্টা। মোট ২ দিন।

প্রশ্ন ৫: ভয়েজার-১ এর পর আর কোন যান এত দূরে গেছে?

উত্তর: না। ভয়েজার-১ ই মানুষের বানানো সবচেয়ে দূরের বস্তু। এর পরে আছে ভয়েজার-২। মানুষের আর কোনো যান এত দূর যেতে পারে নাই।

Post a Comment

Previous Post Next Post