ডায়াবেটিস কি? লক্ষণ, কারণ, চিকিৎসা, নিয়ন্ত্রণ ও খাদ্যাভ্যাস: সম্পূর্ণ গাইডলাইন

ডায়াবেটিস হচ্ছে বর্তমানে বিশ্বের অন্যতম সাধারণ দীর্ঘমেয়াদি স্বাস্থ্য সমস্যা। বাংলাদেশে বিগত কয়েক বছর ধরে ডায়াবেটিসে আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা দিনদিন বেড়েই চলেছে। অনেকে মানুষ বছরের পর বছর এই রোগে আক্রান্ত থাকলেও শুরুতে কোনো স্পষ্ট লক্ষণ অনুভব করতে পারেন না। যার ফলে রোগ শনাক্তে অনেক দেরি হয় এবং পরবর্তীতে হৃদরোগ, কিডনির রোগ, চোখের সমস্যা, স্নায়ুর জটিলতাসহ অন্যান্য অনেক গুরুতর স্বাস্থ্যঝুঁকির মুখে পড়তে হয়।

ভালো খবর হলো, যথাসময়ে ডায়াবেটিস শনাক্ত করতে পারলে এবং সঠিক পদ্ধতিতে জীবনযাপন, স্বাস্থ্যসম্মত খাদ্যাভ্যাস, নিয়মিত শারীরিক ব্যায়াম ও চিকিৎসকের পরামর্শ মেনে চলতে পারলে অধিকাংশ মানুষ দীর্ঘদিন সুস্থ-সবল ও স্বাভাবিক জীবনযাপন করতে পারেন।


এই আর্টিকেলটি পড়ে আপনি জানতে পারবেন—

ক. ডায়াবেটিস কী? কেন ডায়াবেটিস হয়?

খ. ডায়াবেটিসের প্রাথমিক ও গুরুতর লক্ষণ কী কী?

গ. কারা বেশি ঝুঁকিতে থাকেন?

ঘ. কীভাবে পরীক্ষা করে ডায়াবেটিস নির্ণয় করা হয়?

ঙ. কী ধরনের চিকিৎসা রয়েছে? কী খাবেন এবং কী খাবেন না?

চ. কীভাবে ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণে রাখা যায়? ডায়াবেটিস প্রতিরোধের উপায় কী?


আপনি যদি নিজে ডায়াবেটি রোগে আক্রান্ত হয়ে থাকেন অথবা আপনার পরিবারের কেউ ডায়াবেটিসে ভুগেন কিংবা ভবিষ্যতে এই রোগের ঝুঁকি কমাতে ইচ্ছুক হোন তাহলে এই আর্টিকেলটি হতে চলেছে আপনার জন্য দারুন সহায়ক। প্রথমে আমরা জেনে নিবো ডায়াবেটিস কী এবং ডায়াবেটিস কত প্রকার? ডায়াবেটিস কেন হয়?

ডায়াবেটিস কী?

ডায়াবেটিস (Diabetes Mellitus) হচ্ছে বিশ্বব্যাপী বহুল আলোচিত এমন একটি দীর্ঘমেয়াদি রোগ, যার ফলে আক্রান্ত মানুষ তার শরীরের রক্তে থাকা গ্লুকোজ/সুগার (চিনি) কে স্বাভাবিকভাবে ব্যবহার করতে অক্ষম হয়ে পড়ে। এর অন্যতম প্রধান কারণ হচ্ছে শরীরে পর্যাপ্ত পরিমাণে ইনসুলিন তৈরি না হওয়া অথবা তৈরিকৃত ইনসুলিন কার্যকরভাবে ব্যবহৃত না হওয়া।

ইনসুলিন হচ্ছে অগ্ন্যাশয় (Pancreas) থেকে নিঃসৃত এক ধরনের গুরুত্বপূর্ণ হরমোন। প্রতিনিয়ত আমরা যেসব খাবার খাই, সেই খাদ্য উপাদানের কার্বোহাইড্রেট ভেঙে গ্লুকোজে পরিণত হয়। এই সব গ্লুকোজ শরীরের বিভিন্ন কোষে পৌঁছে গিয়ে শক্তি উৎপাদন করে। এক্ষেত্রে সহায়ক ভূমিকা পালন করে থাকে ইনসুলিন। কিন্তু যখন মানব শরীরে ইনসুলিনের ঘাটতি দেখা যায় বা ইনসুলিন সঠিকভা কাজ করতে অক্ষম হয়ে পড়ে, তখন গ্লুকোজ শক্তি উৎপাদন না করতে পেরে রক্তেই জমতে থাকে। এর ফলে রক্তে শর্করার মাত্রা অস্বাভাবিক মাত্রায় বেড়ে যায়, যাকে চিকিৎসা বিজ্ঞানের ভাষায় বলা হয় উচ্চ রক্তশর্করা (High Blood Sugar)। 

এভাবে দীর্ঘদিন রক্তে শর্করা নিয়ন্ত্রণহীন থাকলে তা মানুষের শরীরের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গের ক্ষতিসাধন করতে পারে। বিশেষ করে— হৃদ্‌যন্ত্র,কিডনি, চোখ,স্নায়ুতন্ত্র,রক্তনালি,পা ইত্যাদি অঙ্গ ধীরে ধীরে প্রভাবিত বা ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে, তাই ডায়াবেটিস কে কখনো অবহেলা করার সুযোগ নেই।

ডায়াবেটিস কত প্রকার? 

বর্তমানে এই রোগকে প্রধানত চারটি ভাগে ভাগ করা হয়ে থাকে—

- টাইপ–১ ডায়াবেটিস (Type 1 Diabetes)

- টাইপ–২ ডায়াবেটিস (Type 2 Diabetes)

- গর্ভকালীন ডায়াবেটিস (Gestational Diabetes)

- প্রিডায়াবেটিস (Prediabetes)

একটা বিষয়ে মনে রাখতে হবে যে, ডায়াবেটিস একই ধরনের রোগ হলেও আক্রান্ত সকল রোগীর অবস্থা এক হয় না। ব্যক্তিভেদে ভিন্নতা পরিলক্ষিত হয়ে থাকে। কারণ, ডায়াবেটিসের বিভিন্ন রকমফের রয়েছে এবং প্রতিটি ধরনের কারণ, লক্ষণ, চিকিৎসা ও ঝুঁকিতে রয়েছে ভিন্নতা।

ডায়াবেটিস কি সম্পূর্ণ ভালো হয়ে যায়?

বর্তমান বিশ্বে অধিকাংশ ধরনের ডায়াবেটিসের স্থায়ী ও ফলপ্রসু কোনো চিকিৎসা নেই। তবে সঠিকভাবে খাদ্যগ্রহণ, নিয়মিত শারীরিক ব্যায়াম, ওজন নিয়ন্ত্রণে রাখা, প্রয়োজনীয় ওষুধ বা ইনসুলিন এবং লাইসেন্সপ্রাপ্ত চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী জীবনধারণ করলে অনেক ক্ষেত্রেই রক্তে শর্করাকে দীর্ঘদিন স্বাভাবিক সীমায় রাখা সম্ভব হয়। বিশেষ করে টাইপ–২টিসের ক্ষেত্রে কিছু কিছু রোগীকে স্বাস্থ্যকর জীবনযাপনের মাধ্যমে একটা দীর্ঘ সময়ের জন্য রোগ নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব হয়।

কেন ডায়াবেটিস সম্পর্কে সচেতন থাকা জরুরি?

বর্তমানে অনেক মানুষ ডায়াবেটিসে আক্রান্ত হলেও প্রাথমিক পর্যায়ে রোগের কোনো লক্ষণ বুঝতেই পারেন না। তাই নিয়মিত নিজের স্বাস্থ্য পরীক্ষা এবং ঝুঁকির বিষয়গুলো জেনে সেই সম্পর্কে সচেতন থাকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। কারণ দ্রুত রোগ শনাক্ত করতে পারলে এই রোগের জটিলতার ঝুঁকি অনেকাংশে কমানো সম্ভব হয়।বিভিন্ন ধরনের ডায়াবেটিস ও তাদের চিকিৎসা, প্রতিকার সম্পর্কে নিচে বিস্তারিত আলোচনা করা হলো।

১. টাইপ–১ ডায়াবেটিস (Type 1 Diabetes)

টাইপ–১ ডায়াবেটিস হচ্ছে এক ধরনে অটোইমিউন (Autoimmune) রোগ। কোনো মামুষের শরীরের রোগ প্রতিরক্ষাব্যবস্থা ভুল করে অগ্ন্যাশয়ের ইনসুলিন উৎপাদনকারী বিটা কোষগুলোকে ধ্বংস করে দেয়। ফলে শরীরে খুব কম পরিমাণে ইনসুলিন উৎপন্ন হয় অথবা একেবারেই ইনসুলিন তৈরি বন্ধ হয়ে যায়। টাইপ-১ এ সাধারণত শিশু,কিশোর-কিশোরী, তরুণ-তরুণীরা বেশি আক্রান্ত হয়। তবে যেকোনো বয়সের মানুষেরই এটি হতে পারে।

লক্ষণ: টাইপ–১ ডায়াবেটিসের কিছু সাধারণ লক্ষণ রয়েছে। যেমন—

- অতিরিক্ত পানি পিপাসা

- বারবার প্রস্রাবের চাপ

- হঠাৎ ওজন কমে যাওয়া

- অতিরিক্ত ক্ষুধাপাওয়া

- শারীরিক দুর্বলতা

- চোখে ঝাপসা দেখা



চিকিৎসা:

টাইপ–১ ডায়াবেটিসে আক্রান্ত রোগীদের বেঁচে থাকার জন্য নিয়মিতভাবে ইনসুলিন গ্রহণ করতে হয়। পাশাপাশি স্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস, নিয়মিত রক্তে শর্করা ও গ্লুকোজ পরীক্ষা এবং চিকিৎসকের পরামর্শ মেনে চলা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।


২. টাইপ–২ ডায়াবেটিস (Type 2 Diabetes)

টাইপ–২ ডায়াবেটিসস হচ্ছে বিশ্বের সবচেয়ে বেশি পরিমাণে হওয়া ডায়াবেটিস। বাংলাদেশের অধিকাংশ ডায়াবেটিস রোগী সাধারণত এই ধরনের হয়ে থাকে। এ ক্ষেত্রে শরীর ইনসুলিন ঠিকই তৈরি করতে পারে কিন্তু উৎপন্ন হওয়া ইনসুলিন কে যথাযথভাবে কাজে লাগাতে পারে না (Insulin Resistance)। এর ফলে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে ইনসুলিন উৎপাদনও ব্যাহত হয়।

ঝুঁকির কারণ:

- অতিরিক্ত ওজন

- স্থূলতা

- কায়িক পরিশ্রমের অভাব

- অস্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস

- পারিবারিক ইতিহাস

- বয়স বৃদ্ধি

- উচ্চ রক্তচাপ

- উচ্চ কোলেস্টেরল


চিকিৎসা:

টাইপ–২ ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণে যা করতে হবে—

- স্বাস্থ্যকর খাদ্য গ্রহণ করা

- নিয়মিত ব্যায়াম করা

- ওজন নিয়ন্ত্রণে রাখা

- প্রয়োজনীয় ওষুধ সেবন

- কিছু ক্ষেত্রে ইনসুলিন গ্রহণ করতে হবে।

অনেক রোগী তার জীবনযাত্রার ইতিবাচক পরিবর্তন ঘটিয়ে দীর্ঘ সময় রক্তে শর্করা নিয়ন্ত্রণে রাখতে সক্ষম হয়েছেন এমন অসংখ্য নজির রয়েছে।


৩. গর্ভকালীন ডায়াবেটিস (Gestational Diabetes)

ডায়াবেটিসের তৃতীয় ধরণটা হচ্ছে গর্ভকালীন ডায়াবেটিস।সাধারণত গর্ভাবস্থায় প্রথমবারে রক্তে শর্করার মাত্রা পরিমাণে বেড়ে গেলে তাকে গর্ভকালীন ডায়াবেটিস বলা হয়ে থাকে। সকল গর্ভবতী নারীর ক্ষেত্রে এই সমস্যা হয় না। তবে কিছু কিছু নারীর ক্ষেত্রে গর্ভাবস্থার সময়ে হরমোনের কিছু পরিবর্তনের কারণে উৎপন্ন হওয়া ইনসুলিন ঠিকমতো কাজ করতে পারে না।


ঝুঁকির কারণ:

- অতিরিক্ত ওজন হওয়া

- পূর্বে গর্ভকালীন ডায়াবেটিসের ইতিহাস থাকা

- পরিবারে কারো ডায়াবেটিস থাকা

- ৩০ বছরের বেশি বয়সে গর্ভধারণ করা

- পূর্বে বড় ওজনের শিশু জন্ম দেওয়া ইত্যাদি। 


কেন এটি গুরুত্বপূর্ণ?

এটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ সময়মতো চিকিৎসা না করলে—

- শিশুর ওজন অতিরিক্ত হতে পারে

- প্রসবে জটিলতা হওয়ার আশঙ্কা থাকে।

তাই গর্ভাবস্থায় দক্ষ চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী নিয়মিত রক্তে শর্করা পরীক্ষা করে চেক আপ করতে হবে।


৪. প্রিডায়াবেটিস (Prediabetes)

প্রিডায়াবেটিস হচ্ছে ডায়াবেটিসের পূর্বাবস্থা। অর্থাৎ, এটি এমন একটি অবস্থা যেখানে শরীরের রক্তে শর্করার মাত্রা স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি উৎপন্ন হচ্ছে, কিন্তু এখনো ডায়াবেটিসের পর্যায়ে পৌঁছায় যায় নাই। এটি অনেকটা সতর্ক সংকেতের মতো।

কেন গুরুত্ব দেবেন?

যদি এই রকম পর্যায়ে খাদ্যাভ্যাসও জীবনযাত্রায় ইতিবাচক পরিবর্তন আনাসম্ভব হয়, তাহলে অনেক ক্ষেত্রে ভবিষ্যতে এইটাইপ–২ ডায়াবেটিস হওয়ার ঝুঁকি উল্লেখযোগ্যভাবে কমানো সম্ভব হয়।


কী করবেন?

- শরীরে ওজন নিয়ন্ত্রণ করুন

- প্রতিদিন নিয়মিত হাঁটাচলা করুন বা ব্যায়াম করুন

- চিনি জাতীয় খাবার খাওয়া কমান

- পর্যাপ্ত পরিমাণে ঘুম নিশ্চিত করুন

- নিয়মিত রক্তে শর্করার পরিমাণ জানতে।পরীক্ষা করুন


মনে রাখবেন সব ধরনের ডায়াবেটিসের উপসর্গ ও লক্ষণ যেমন এক নশ তেমনি চিকিৎসা পদ্ধতিত এক নয়। তাই এক্ষেত্রে নিজে থেকে ওষুধ নির্বাচন ও পরিবর্তন একেবারে অনুচিত। সঠিক সময়ে রোগ নির্ণয়,চিকিৎসা ও পরামর্শের জন্য নিবন্ধিত চিকিৎসকের শরণাপন্ন হওয়া উচিৎ। ।

ডায়াবেটিস কেন হয়? কারণ, ঝুঁকির কারণ ও প্রতিরোধের উপায়

ডায়াবেটিস রোগটা হঠাৎ করে একদিনে হয় না। এটি অধিকাংশ ক্ষেত্রে মানুষের দীর্ঘদিনের জীবনযাত্রা, তার বংশগত বৈশিষ্ট্য, শরীরের হরমোনজনিত পরিবর্তন এবং অন্যান্য স্বাস্থ্যগত কারণে হয়ে থাকে। 

ডায়াবেটিস কেন হয়?

ডায়াবেটিসের প্রধান কারণসমূহ নিচে উল্লেখ করা হলো:

১. বংশগত বা পারিবারিক ইতিহাস: আগে থেকেই যদি পরিবারের কোনো সদস্য যেমন বাবা, মা, ভাই বা বোনের ডায়াবেটিস থাকে, তাহলে অন্য সদস্যদেরও এই রোগে আক্রান্ত হওয়ার একটা ঝুঁকি থেকে যায়। তবে যে শুধু বংশগত কারণ থাকলেই ডায়াবেটিস হবে—বিষয়টা মোটেও এমন নয়। স্বাস্থ্যকর জীবনযাপন ও নিয়ন্ত্রতিত খাদ্যাভ্যাসের পরিবর্তন ডায়াবেটিসের ঝুঁকি কমাতে সাহায্য করতে পারে।

২. অতিরিক্ত ওজন ও স্থূলতা: ডায়াবেটিস হওয়ার পেছনে আরেকটি অন্যতম বিশেষ কারণ হচ্ছে অতিরিক্ত ওজন, মেদ ও স্থুলতা বৃদ্ধি পাওয়া।শরীরে ও পেটের চারদিকে অতিরিক্ত চর্বি জমে গেলে শরীরে ইনসুলিন রেজিস্ট্যান্স হওয়ার আশঙ্কা থাকে অর্থাৎ শরীর ইনসুলিনের প্রতি কম সাড়া দিয়ে থাকে!

ঝুঁকি কমাতে কী করবেন?

—স্বাস্থ্যকর ওজন বজায় রাখুন।

—প্রতিদিন নিয়মিত ব্যায়াম করুন।

—অতিরিক্ত ক্যালরিযুক্ত খাবার খাওয়া কমিয়ে দিন।

৩. শারীরিক পরিশ্রমের অভাব: অলসতা ডায়াবেটিস হওয়ার অন্যতম বড় কারণ। দীর্ঘ সময় বসে বসে কাজ করা,নিয়মিত শারীরিক ব্যায়াম না করা এবং কম চলাফেরা করলে শরীরের ইনসুলিন ব্যবহারের সক্ষমতা ও দক্ষতা কমে যাওয়ার আশঙ্কা থাকে।

প্রতিদিন কী করবেন?

প্রতিদিন ঘড়ি দেখে অন্তত ৩০ মিনিট দ্রুত হাঁটার চেষ্টা করুন।

দীর্ঘক্ষণ বসে থাকলে মাঝেমধ্যে উঠে হাঁটুন ও নড়াচড়া করুন। কায়িক পরিশ্রম করুন।

৪. অস্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস: অস্বাস্থ্যকর খাদ্যভ্যাসের কারণেও ডায়েবিটিস হয়ে থাকে। দীর্ঘদিন ধরে অতিরিক্ত—কোমল পানীয় পান করা, মিষ্টিজাতীয় খাবার গ্রহণ করে, ফাস্টফুড খাওয়া, অতিরিক্ত তেলে ভাজা খাবার খাওয়া, অতিরিক্ত প্রক্রিয়াজাত করা খাবার খেলে ওজন বেড়ে যাওয়ার ঝুকি বাড়রে এবং টাইপ–২ ডায়াবেটিসের ঝুঁকিও বেড়ে যেতে পারে। অন্যদিকে সবুজ শাকসবজি, টাটকা ফল, ডাল, আঁশযুক্ত খাবার ও পরিমিত শস্যভিত্তিক খাদ্যাভ্যাস সুস্বাস্থ্যের জন্য সহায়ক ভূমিকা পালন করে থাকে।

৫. বয়স বৃদ্ধি: বর্তমানে মানুষের বয়স বাড়ার সাথে সাথপ টাইপ–২ ডায়াবেটিস হওয়ার ঝুঁকি বাড়তে পারে। তবে বর্তমানে কম বয়সী অনেক মানুষজন অতিরিক্ত ওজন বৃদ্ধি ও অস্বাস্থ্যকর জীবনযাপনের কারণেই প্রতিনিয়ত এই রোগে আক্রান্ত হচ্ছেন।

৬. উচ্চ রক্তচাপ ও কোলেস্টেরলের সমস্যা: সাধারণ উচ্চ রক্তচাপ, অস্বাভাবিক পরিমাণের কোলেস্টেরল এবং হৃদ্‌রোগের ঝুঁকির সঙ্গে ডায়াবেটিসের একটা গভীর সম্পর্ক লক্ষণীয়। তাই কারো শরীরে এসব সমস্যা থাকলে নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষা ও চেকআপ করা উচিত। ডাক্তারের পরামর্শ নেওয়া উচিৎ। 

৭. গর্ভকালীন ডায়াবেটিসের ইতিহাস: যেসব নারীগর্ভাবস্থায় থাকাকালীন ডায়াবেটিস স্বীকার হয়েছিল, তাদের গর্ভ পরবর্তী জীবনেও টাইপ–২ ডায়াবেটিস হওয়ার প্রবল ঝুঁকি রয়ে যায়।

৮. পর্যাপ্ত ঘুমের অভাব: পর্যাপ্ত পরিমাণে ঘুমের অভাব বা অনিয়মিত ঘুম আমাদের শরীরের হরমোনের ভারসাম্যে নষ্ট করতে পারে, ফলে তা দীর্ঘমেয়াদে ডায়াবেটিসের ঝুঁকি বাড়ার সমূহ সম্ভাবনা তৈরি করে।

৯. মানসিক চাপ: কারো দীর্ঘদিনের মানসিক চাপ, অশান্তি, উদ্বেগ বা বিষণ্নতা অস্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস,একেবারে কম শারীরিক পরিশ্রম এবং ঘুমের সমস্যা ইত্যাদির সঙ্গে যুক্ত থাকে। এসব বিষয় প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে ডায়াবেটিসের ঝুঁকি বাড়াতে পারে বলে গবেষকেরা মনে করেন। 

ডায়াবেটিসের ঝুঁকিতে কারা সবচেয়ে বেশি?

নিচের এক বা একাধিক বিষয় যদি আপনার সাথে মিলে যায় তাহলে নিয়মিত রক্তে শর্করা পরীক্ষা করার বিষয়ে চিকিৎসকের সঙ্গে পরামর্শ করুন, সতর্ক ও সচেতন থাকুন।

১. পরিবারের যেকোনো সদস্যের ডায়াবেটিস আছে।

২. আপনার শরীরের অতিরিক্ত ওজন বা স্থূলতা রয়েছে।

৩. নিয়মিত ব্যায়াম করেন না।

৪. আপনার উচ্চ রক্তচাপ রয়েছে।

৫. কোলেস্টেরলের পরিমাণ বেশি।

৬. আগে গর্ভকালীন সময়ে ডায়াবেটিস হয়েছিল।

৭. বয়স বাড়ছে কিন্তু জীবনযাপনে কম সক্রিয়। কায়িকশ্রম কম করেন।

৮. চিকিৎসক আপনার প্রিডায়াবেটিস শনাক্ত করেছেন।


ডায়াবেটিসের ঝুঁকি কমানোর উপায়:

ডায়াবেটিস হওয়ার সব কারণ নিয়ন্ত্রণ করা পুরোপুরি সম্ভব নয়, যেমন বংশগত বৈশিষ্ট্যকে নিয়ন্ত্রণ করা যায় না। তবে অনেক ক্ষেত্রে ঝুঁকির কারণ নিয়ন্ত্রণ করা যায়। ঝুঁকি এড়াতে—

ক. স্বাস্থ্যকর অভ্যাস গড়ে তুলুন, খাদ্যাভ্যাসে পরিবর্তন আনুন

খ. প্রতিদিন নিয়মিত হাঁটা বা ব্যায়াম করুন। দৌড়াদৌড়ি করুন, পরিশ্রম করুন।

গ. ওজন নিয়ন্ত্রণে রাখার চেষ্টা করুন।

ঘ. পর্যাপ্ত সবুজ ও টাটকা শাকসবজি এবং আঁশযুক্ত খাবার খান।

ঙ. অতিরিক্ত পরিমাণে চিনি ও চিনিযুক্ত পানীয় পান করা থেকে যথাসম্ভব এড়িয়ে চলুন।

চ. ধূমপান করে থাকলে তা এড়িয়ে চলুন।

ছ. প্রতিদিন পর্যাপ্ত ঘুম নিশ্চিত করুন।

জ. নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষা করুন।


অনেক মানুষ ভাবেন যে, "বেশি পরিমাণে মিষ্টিজাতীয় খাবার খেলেই ডায়াবেটিস হয়।" বাস্তবে বিষয়টি এমন না। ডায়াবেটিস হচ্ছে একটি বহুমাত্রিক রোগ। নিজের বংশগত ঝুঁকি, দৈহিক ওজন, শারীরিক কার্যকলাপ, খাদ্যাভ্যাস ও চালচলন এবং অন্যান্য স্বাস্থ্যগত কারণ সবকিছু মিলে এর ঝুঁকিতে ভূমিকা রাখতে পারে।

প্রশ্নোত্তর - FAQ

প্রশ্ন ১: ডায়াবেটিস কি?

উত্তর: ডায়াবেটিস হলো এমন একটি রোগ যেখানে রক্তে গ্লুকোজের মাত্রা স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি থাকে।

প্রশ্ন ২: ডায়াবেটিস এর প্রধান লক্ষণ কি?

উত্তর: ঘন ঘন প্রস্রাব, অতিরিক্ত তৃষ্ণা, ক্ষুধা লাগা, ক্লান্তি এবং ওজন কমে যাওয়া।

প্রশ্ন ৩: ডায়াবেটিস কি ভালো হয়?

উত্তর: টাইপ ২ ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব। সঠিক খাদ্য, ব্যায়াম ওষুধের মাধ্যমে এটি নিয়ন্ত্রণে রাখা যায়।

Post a Comment

Previous Post Next Post