বাংলাদেশের সাংবিধানিক ইতিহাসে আজ আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়ের সূচনা হলো আপিল বিভাগের দেওয়স সাম্প্রতিক রায়ের মাধ্যমে। আজকের রায়ে পঞ্চদশ সংশোধনীর কিছু গুরুত্বপূর্ণ বিধানকে বাতিল করে হাইকোর্টের রায়কে বহাল রেখেছেন আপিল বিভাগ। এতে বাংলাদেশের সংবিধানে গণভোট ও তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা পুনরায় ফিরেছে বলে জানিয়েছেন আইনজীবী শিশির মনির। আজ বৃহস্পতিবার (৯ জুলাই) সকালে প্রধান বিচারপতি জুবায়ের রহমান চৌধুরীর নেতৃত্বাধীন চার সদস্যের একটি আপিল বিভাগ এ রায় ঘোষণা করেন।
মূলত পঞ্চদশ সংশোধনী নিয়ে হাইকোর্টের রায়ের বিরুদ্ধে আপিল করেছিলেন সুজন সম্পাদক বদিউল আলম মজুমদার, নওগাঁর মোহাম্মদ মোফাজ্জল হোসেন এবং বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার।
বাংলাদেশের সংবিধানের সাথে সাংঘর্ষিক নয় এমনসব বিষয়কে বাদ দিয়ে পঞ্চদশ সংশোধনীর বাকি বিষয়গুলোকে সংসদ সদস্য তথা সংসদের ওপর ছেড়ে দেয়ার আবেদন জানিয়ে আজ বুধবার (৮ জুলাই) শুনানি শেষ করেন অ্যাটর্নি জেনারেল রুহুল কুদ্দুস কাজল।
বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর পক্ষ থেকেও একই রকম আবেদন জানানো হয়। আবেদনটি ব্রিফ করেন আইনজীবী শিশির মনির। তিনি বলেন, পঞ্চদশ সংশোধনীর যে সকলবিষয় সচরাচর মৌলিক কাঠামোর সাথে সাংঘর্ষিক সেগুলোকে বাতিল এবং বাকিগুলোকে সংসদের উপর ছেড়ে দেয়া উচিৎ। তবে আরেক আপিলকারী সুজনের সম্পাদক বদিউল আলম মজুমদারের আইনজীবী শরীফ ভূঁইয়া দাবি জানান ৯৬ ও ১০২ অনুচ্ছেদ বাদে পুরো পঞ্চদশ সংশোধনীকেই বাতিল করা হোক।
পঞ্চদশ সংবিধান সংশোধনীর এসব বিধানকে বাতিল করে হাইকোর্টের দেওয়া রায়ের ফলে সংবিধানে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থার পাশাপাশি গণভোটের বিধানপ পুনরায় কার্যকর হয়েছে বলে মত ব্যক্ত করেছেন সংশ্লিষ্ট আইনজীবীরা। প্রধান বিচারপতি জুবায়ের রহমান চৌধুরীর নেতৃত্বাধীন চার সদস্যের আপিল বিভাগের এই রায়টি বাংলাদেশের নির্বাচন ব্যবস্থা, সংবিধান,নির্বাচন এবং ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক প্রক্রিয়ার ওপর গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলতে পারে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।
কী রায় দিয়েছেন আপিল বিভাগ?
আপিল বিভাগ আজ ৯ জুলাই (বৃহষ্পতিবার) পঞ্চদশ সংশোধনীর কিছু আলোচিত অংশের বিষয়ে হাইকোর্টের দেওয়া রায়কে পুনর্বহাল রেখেছেন। এর অর্থ হচ্ছে পূর্বে যেসব বিধানকে হাইকোর্ট সংবিধানের মৌলিক কাঠামোর সঙ্গে অসামঞ্জস্যপূর্ণ হিসেবে বিবেচনা করে বাতিল ঘোষণা করেছিলন সেগুলো আর কার্যকর থাকবে না।
রায়ের পর আইনজীবীরা জানিয়েছেন, উক্ত রায়ের ফলে সংবিধানে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা ও গণভোটের বিধান ফিরে এসেছে। তবে রায়ের পূর্ণাঙ্গ অনুলিপি প্রকাশ হওয়ার পরে আরো বিস্তারিত জানা যাবে কোন কোন অনুচ্ছেদ কীভাবে কার্যকর হবে, সে বিষয়ে আরও স্পষ্ট ধারণা পাওয়া যাবে তখন।
কেন হয়েছিল এই আপিল?
পঞ্চদশ সংশোধনী নিয়ে হাইকোর্টের পূর্বের রায়ের বিরুদ্ধে আপিল করেন তিনজন ব্যক্তি।
১. সুজন সম্পাদক বদিউল আলম মজুমদার
২. নওগাঁর মো. মোফাজ্জল হোসেন
৩. বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার
আপিলকারীদের আবেদনের মূল উদ্দেশ্য ছিল, পঞ্চদশ সংশোধনীর বৈধতা নিশ্চিত এবং সংবিধানের মৌলিক কাঠামোর সঙ্গে এর সামঞ্জস্যতা বিচার করা। শুনানিতে কে কী যুক্তি দিয়েছেন?
অ্যাটর্নি জেনারেলের বক্তব্য:
রাষ্ট্রের পক্ষের অ্যাটর্নি জেনারেল রুহুল কুদ্দুস কাজল আদালতে বলেন, যেসব বিষয় আমাদের সংবিধানের সাথে সাংঘর্ষিক নয়, সেগুলো কে বহাল তবিয়তে রাখা যেতে পারে। আর যেসব বিষয়ে প্রশ্ন রয়েছে, সমালোচনা রয়েছে সেগুলোর বিষয় সংসদের উপর ছেড়ে দেওয়া হোক, তারাই সিদ্ধান্ত নিক। অর্থাৎ তার বক্তব্যমতে তিনি পুরো পঞ্চদশ সংশোধনী বাতিলের পক্ষে ছিলেন না।
জামায়াতের আইনজীবীর বক্তব্য:
বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আইনজীবী শিশির মনির আদালতে বলেন, পঞ্চদশ সংশোধনীর যেসব অংশ ও বিষয়ে সংবিধানের মৌলিক কাঠামোর বিরুদ্ধে যায় ও সাংঘর্ষিক, শুধু সেগুলোকে বাতিল করা উচিত। অন্য অংশগুলো সংসদের ওপর ছেড়ে দেওয়া যেতে পারে বলে মন্তব্য করেন তিনি।
সুজনের পক্ষের বক্তব্য:
সুজনের সম্পাদক বদিউল আলম মজুমদারের আইনজীবী শরীফ ভূঁইয়া এ বিষয়ে আরও কঠোর অবস্থান নেন। তিনি ৯৬ ও ১০২ অনুচ্ছেদ ছাড়া পুরো পঞ্চদশ সংশোধনী বাতিলের আবেদন করেন।
পঞ্চদশ সংশোধনী কী?
২০১১ সালে জাতীয় সংসদে সংবিধানের পঞ্চদশ সংশোধনী পাস করা হয়ছিল। এই সংশোধনীর মাধ্যমে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ সাংবাদিক ও রাষ্ট্রীয় পরিবর্তন আনা হয়েছিল, যেমন—
তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা বাতিল করা হয়েছিল।
গণভোটের বিধান বাতিল করা হয়েছিল।
সংবিধানের কিছু মৌলিক নীতির পুনর্বিন্যাস করা হয়েছিল।
কয়েকটি সাংবিধানিক অনুচ্ছেদে পরিবর্তন ও পরিবর্ধন আনা হয়েছিল। এসবের মধ্যে সবচেয়ে বেশি বিতর্ক সৃষ্টি হয়েছিল তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থাকে বাতিল প্রসঙ্গ নিয়ে।
তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা কী?
তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা ছিল মূলত একটি অস্থায়ী, নির্দলীয় প্রশাসন, যার প্রধান দায়িত্ব থাকে জাতীয় সংসদ নির্বাচন সুষ্ঠুভাবে আয়োজন করা এবং অংশগ্রহণকারীদের জন্য একটি নিরাপদ ও লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড নিশ্চিত করা। এর বৈশিষ্ট্য ছিল—
ক. রাজনৈতিকভাবে একদম নিরপেক্ষ থাকা
খ. সীমিত সময় দায়িত্ব পালন করা অর্থাৎ নির্বাচন দিয়েই বিদায় নেওয়া।
গ. স্বাধীনভাবে দৈনন্দিন প্রশাসনিক কাজ পরিচালনা করা
ঘ. নির্বাচন কমিশনকে স্বাধীনভাবে নির্বাচন আয়োজনের সুযোগ করে দেওয়া। অতীতে বাংলাদেশে ১৯৯৬ সাল থেকে কয়েকটি জাতীয় সংসদ নির্বাচন এই ব্যবস্থার অধীনে অনুষ্ঠিত হয়েছিল।
কেন এটি বাতিল করা হয়েছিল?
পঞ্চদশ সংশোধনীর মাধ্যমে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থাকে বাতিল করার পেছনে যুক্তি দেওয়া হয়েছিল—
ক. নির্বাচিত সরকারের অধীনেই জাতীয় নির্বাচন হওয়া উচিত।
খ. তত্ত্বাবধায়ক সরকার বিদ্যমান সংবিধানের স্থায়ী কাঠামোর অংশ নয়।
গ. অস্থায়ী সরকার ব্যবস্থায় ভবিষ্যতে সাংবিধানিক জটিলতা তৈরি হওয়ার আশঙ্কা থাকে।
অন্যদিকে বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলো দীর্ঘদিন ধরে এই অগণতান্ত্রিক সিদ্ধান্তের তীব্র বিরোধিতা করে আসছিল। বিশেষ করে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) এবং বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী জোটবদ্ধ হয়ে রাজপথে আন্দোলন সংগ্রাম করেছিল এই ইস্যুতে।
গণভোট ও তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা: অতীত, বর্তমান ও ভবিষ্যৎ:
বাংলাদেশে ইতিহাসে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থার ধারণা আসে দীর্ঘদিনের চলমান রাজনৈতিক অস্থিরতা ও নির্বাচনকালীন সরকারের নিরপেক্ষতা নিয়ে বিতর্কের প্রেক্ষাপটে বিষয়টি বই লেখার মাধ্যমে সবার সামনে তুলে ধরে জামায়াত নেতা গোলাম আজম। তিনি সর্বপ্রথম তত্বাবধায়ক সরকারের রূপরেখা পেশ করেন এবং এটি ১৯৯৬ সালে সংবিধানের ত্রয়োদশ সংশোধনীর মাধ্যমে সংবিধানে সংযুক্ত করা হয়। এই পদ্ধতির মূল উদ্দেশ্য ছিল জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সব দলের কাছে গ্রহণযোগ্য ও সুষ্ঠু করা। নিরাপদ পরিবেশ সৃষ্টি করা। এই নির্বাচন ব্যবস্থায় একটি নির্দলীয় নিরপেক্ষ অন্তর্বর্তীকালীন সরকার সর্বোচ্চ ৯০ দিনের জন্য ক্ষমতা গ্রহণ করে। তারা কোনো নীতিগত বা দীর্ঘমেয়াদি সিদ্ধান্ত নেওয়ার অধিকার রাখে না। শুধুমাত্র দেশের দৈনন্দিন প্রশাসনিক কার্যক্রম পরিচালনা এবং নির্বাচন কমিশনকে স্বাধীনভাবে নির্বাচন আয়োজনের পরিবেশ নিশ্চিত করার জন্য রাষ্ট্রীয়ভাবে সাহায্য করে যায়।
বিগত ১৯৯৬, ২০০১ এবং ২০০৮ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচনগুলো তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনেই অনুষ্ঠিত হয়েছিল। তারমধ্যে ২০০৮ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচনে দেশি-বিদেশি অনেক পর্যবেক্ষক এসেছিলেন এবং তাদের কাছে তুলনামূলকভাবে অবাধ ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচন হিসেবে মূল্যায়িত হয়েছিল। তবে ২০০৭ সালের জরুরি অবস্থার সময় তত্ত্বাবধায়ক সরকারের মেয়াদ দীর্ঘায়িত হওয়া এবং রাজনৈতিক সংকট সৃষ্টি হওয়ায় এই ব্যবস্থা নিয়েও নানা প্রশ্ন ওঠে, আলোচনা, সমালোচনার সৃষ্টি হয়। ২০১১ সালে সংবিধানের পঞ্চদশ সংশোধনীর মাধ্যমে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থাকে বাতিল করে আ.লীগ সরকার। সরকার সেই সময় যুক্তি দিয়েছিল যে নির্বাচিত সরকারের অধীনেই নির্বাচন হওয়া গণতান্ত্রিক রীতি এবং অনির্বাচিত সরকারের হাতে রাষ্ট্র পরিচালনার সুযোগ রাখা উচিত নয়। অন্যদিকে বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলো এই সিদ্ধান্তের তীব্র বিরোধিতা করেন এবং নির্বাচনকালীন নিরপেক্ষ সরকারের দাবিতে রাজপথে অব্যাহত মিছিল, মিটিং ও অবরোধের সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন।
সাম্প্রতিক আপিল বিভাগের রায়ের পর আইনজীবীরা মনে করছেন যে, সংবিধানে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থার বিধানটি আবারও ফিরে আসলো। তবে এটি কীভাবে বাস্তবায়িত হবে, নতুন করে আইনের প্রয়োজন হবে কি না কিংবা ভবিষ্যৎ নির্বাচনগুলোতে এই পদ্ধতিকে অনুসরণ করা হবে কিনা—এসব বিষয়ে চূড়ান্ত ব্যাখ্যা নির্ভর করবে আদালতের পূর্ণাঙ্গ রায় প্রকাশিত হওয়া এবং পরবর্তী সাংবিধানিক পদক্ষেপের ওপর।
গণভোটের ইতিহাস ও গুরুত্ব
গণভোট হলো এমন একটি সাংবিধানিক ব্যবস্থা, যেখানে দেশের গুরুত্বপূর্ণ কোনো বিষয়ে জনগণ সরাসরি ভোট দিয়ে সিদ্ধান্ত দেয়। এটি প্রতিনিধিদের মাধ্যমে নয়, বরং জনগণের প্রত্যক্ষ মতামত গ্রহণের একটি গণতান্ত্রিক পদ্ধতি। বাংলাদেশের সংবিধানে একসময় গণভোটের বিধান ছিল। অতীতে রাষ্ট্রপতি শাসিত ও সংসদীয় সরকার ব্যবস্থা, সংবিধানের গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তনসহ বিভিন্ন বিষয়ে গণভোট অনুষ্ঠিত হয়েছে। তবে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এ বিধানের ব্যবহার কমে যায় এবং ২০১১ সালের পঞ্চদশ সংশোধনীর মাধ্যমে গণভোটের সাংবিধানিক বিধান বাতিল করা হয়।
গণভোটের সমর্থকদের মতে, সংবিধানের মৌলিক পরিবর্তন বা জাতীয় গুরুত্বের বিষয়ে জনগণের সরাসরি মতামত নেওয়া গণতন্ত্রকে আরও শক্তিশালী করে। অন্যদিকে সমালোচকদের মতে, রাজনৈতিক পরিস্থিতির ওপর নির্ভর করে গণভোট কখনো কখনো বিতর্কিতও হতে পারে এবং এর ফলাফলকে রাজনৈতিকভাবে প্রভাবিত করার আশঙ্কা থাকে।
আপিল বিভাগের সাম্প্রতিক রায়ের পর আইনজীবীরা বলছেন, গণভোটের বিধানও পুনরায় সংবিধানে ফিরে এসেছে। তবে কোন পরিস্থিতিতে গণভোট অনুষ্ঠিত হবে এবং এর প্রক্রিয়া কী হবে, সে বিষয়ে বিস্তারিত জানা যাবে আদালতের পূর্ণাঙ্গ রায় প্রকাশের পর।
কেন এই রায় এত গুরুত্বপূর্ণ?
বিশেষজ্ঞদের মতে, আজ আপিল বিভাগের এই রায়টি শুধু দুইটি বিধানকে ফিরিয়ে আনার বিষয় নয়; বরং এটি বাংলাদেশ সংবিধানের মৌলিক কাঠামো, বিচার বিভাগের সক্ষমতা, সংসদের আইন প্রণয়নের সীমা-পরিসীমা এবং ভবিষ্যতে জাতীয় নির্বাচন ব্যবস্থার ওপর দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব ফেলতে পারে। এ কারণেই ইতোমধ্যে রাজনৈতিক দলগুলোর পাশাপাশি আইনজীবী, সংবিধান বিশেষজ্ঞ এবং সাধারণ জনগণের মধ্যে এ রায় নিয়ে ব্যাপক আলোচনা শুরু হয়েছে।


Post a Comment